বাংলাদেশের রাজনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে কথার লড়াই ও পারস্পরিক তিক্ততা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। একসময় আন্দোলন ও নির্বাচনী রাজনীতিতে কৌশলগত বোঝাপড়া থাকলেও বর্তমানে দুই দলের অবস্থান, বক্তব্য ও কৌশলে দৃশ্যমান দূরত্ব তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে—এই তিক্ততা কেন তীব্র হচ্ছে, এর পেছনের কারণগুলো কী?

আদর্শ ও রাজনৈতিক অবস্থানের পার্থক্য-বিএনপি নিজেকে জাতীয়তাবাদী ও মধ্যপন্থী গণতান্ত্রিক ধারার দল হিসেবে তুলে ধরে। অন্যদিকে জামায়াতের রাজনীতি ধর্মভিত্তিক আদর্শকেন্দ্রিক। সময়ের সঙ্গে রাষ্ট্রব্যবস্থা, সংবিধান, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রশ্নে দুই দলের দৃষ্টিভঙ্গিতে ফারাক আরও স্পষ্ট হয়েছে। এই আদর্শগত ব্যবধান পারস্পরিক আস্থাকে দুর্বল করছে।

নেতৃত্ব ও ভোটব্যাংকের হিসাব-বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় উভয় দলই নিজেদের স্বতন্ত্র ভোটব্যাংক ধরে রাখতে মরিয়া। বিএনপি মনে করছে, জামায়াতের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা তাদের মধ্যমপন্থী ভোটারদের দূরে সরিয়ে দিতে পারে। অপরদিকে জামায়াতও নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব ও সমর্থনভিত্তি দৃশ্যমান করতে আলাদা অবস্থান জোরালো করছে। এই প্রতিযোগিতামূলক বাস্তবতা কথার লড়াই বাড়াচ্ছে।

আন্দোলন কৌশল ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা-সরকারবিরোধী আন্দোলনের ধরন, সময় ও কর্মসূচি নিয়েও দুই দলের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেবে, কৌশল কী হবে—এসব প্রশ্নে ঐক্যমতের অভাব পারস্পরিক সমালোচনাকে উসকে দিচ্ছে। ফলে বক্তব্যের তীক্ষ্ণতা বাড়ছে।

আন্তর্জাতিক ও সামাজিক চাপ-আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও সুশাসনের প্রশ্নে বিএনপি নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে সচেষ্ট। জামায়াতের অতীত ভূমিকা ও আন্তর্জাতিক ইমেজ নিয়ে বিএনপির ভেতরে উদ্বেগ আছে—এটিও দূরত্ব বৃদ্ধির একটি কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

রাজনীতিতে স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নেই—এ কথা প্রচলিত। প্রয়োজনের তাগিদে ভবিষ্যতে কৌশলগত বোঝাপড়া আবারও হতে পারে। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে আদর্শ, ভোটব্যাংক ও নেতৃত্বের হিসাব—এই তিনটি বিষয়ই বিএনপি-জামায়াতের তিক্ততাকে বাড়িয়ে তুলছে।

বিএনপি ও জামায়াতের কথার যুদ্ধ কেবল ব্যক্তিগত বা তাৎক্ষণিক নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনীতির পরিবর্তিত সমীকরণের প্রতিফলন। গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বার্থে গঠনমূলক সংলাপ ও দায়িত্বশীল বক্তব্যই পারে এই উত্তেজনা কমাতে—না হলে রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
লেখক:খ.ম.হারুনুর রশীদ ঢালী,সভাপতি, কসবা উপজেলা প্রেসক্লাব ও সম্পাদক ,কসবা টিভি: