খ.ম.হারুনুর রশীদ ঢালী:
সত্য তুলে ধরা পেশার মূল, তবে আইনগত সীমারেখা মানাই বিশ্বাসযোগ্যতার ভিত্তি।
গণমাধ্যমের প্রধান দায়িত্ব হলো তথ্য সংগ্রহ, যাচাই এবং তা নিরপেক্ষভাবে জনগণের সামনে উপস্থাপন করা। সমাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠায় সাংবাদিকদের এই ভূমিকা অপরিহার্য। তবে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় প্রশ্ন উঠছে—তথ্য তুলে ধরার প্রয়াস কখনো কি সীমা অতিক্রমে পরিণত হচ্ছে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, তথ্য প্রকাশ করা কখনোই সীমা লঙ্ঘন নয়; বরং সেটিই সাংবাদিকতার মৌলিক ভিত্তি। কিন্তু তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়া ও উপস্থাপনের ধরন অবশ্যই আইন ও নৈতিকতার কাঠামোর ভেতরে থাকতে হবে। একজন সাংবাদিক যদি তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত অধিকার ক্ষুণ্ন করেন বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাজের সঙ্গে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেন, তাহলে তা পেশাগত সীমার বাইরে চলে যেতে পারে।

আইন ও নৈতিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, কোনো ব্যক্তির পরিচয় উন্মোচন বা তাকে নিয়ন্ত্রণ করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব। সাংবাদিকের কাজ হচ্ছে তথ্য সংগ্রহ, যাচাই এবং তা জনসমক্ষে উপস্থাপন করা। এর বাইরে গিয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ করা পেশাগত সীমালঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি করে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একজন সাংবাদিক যদি কোনো ব্যক্তির বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের পাশাপাশি আইনি জটিলতাও সৃষ্টি করতে পারে। কারণ, একজন ব্যক্তি অভিযুক্ত হলেও আদালতে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি আইনের দৃষ্টিতে নির্দোষ। এ অবস্থায় তার সম্মতি ছাড়া মুখ উন্মুক্ত করা মানবাধিকার প্রশ্নও তুলতে পারে।

এ ধরনের কর্মকাণ্ডের ফলে আরেকটি ঝুঁকি তৈরি হয়—আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব ও ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। যদি সাংবাদিকরা নিয়মিতভাবে এসব কাজে জড়িয়ে পড়েন, তাহলে দায়িত্বের সীমারেখা ঝাপসা হয়ে যেতে পারে এবং ভবিষ্যতে পেশাগত বিশৃঙ্খলার নজির তৈরি হতে পারে।
#
অভিজ্ঞ গণমাধ্যমকর্মীরা মনে করেন, সাংবাদিকদের উচিত ঘটনাস্থলে নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকের ভূমিকা পালন করা এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তাদের দায়িত্ব পালন করতে দেওয়া। প্রয়োজনে তথ্য সংগ্রহে সহযোগিতা করা যেতে পারে, কিন্তু সরাসরি হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়।

গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞদের মতে, সাংবাদিকতার মূল শক্তি তার বিশ্বাসযোগ্যতা ও নৈতিক অবস্থান। সেই জায়গা অক্ষুণ্ন রাখতে হলে পেশাগত আচরণবিধি মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় গণমাধ্যমের প্রতি জনআস্থা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

আইনজ্ঞদের ভাষ্যমতে, কোনো ব্যক্তির সম্মতি ছাড়া তার পরিচয় প্রকাশ, বিশেষ করে তিনি যদি অভিযুক্ত হন কিন্তু অপরাধ প্রমাণিত না হয়, তাহলে তা আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে। একইভাবে, কোনো ঘটনার ভিডিও ধারণ করা বা তথ্য সংগ্রহ করা বৈধ হলেও, কাউকে শারীরিকভাবে স্পর্শ করা, বা জিজ্ঞাসাবাদের মতো আচরণ করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

সাংবাদিকতার নৈতিকতা বলছে—“observe, don’t intervene”—অর্থাৎ পর্যবেক্ষণ ও তথ্য তুলে ধরা, কিন্তু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা না করা। এই নীতি অনুসরণ করলে একদিকে যেমন সাংবাদিক নিজের পেশাগত মর্যাদা রক্ষা করতে পারেন, অন্যদিকে আইনি ঝুঁকিও এড়ানো সম্ভব হয়।
গণমাধ্যম বিশ্লেষকরা মনে করেন, দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা মানে শুধু খবর প্রকাশ নয়, বরং কীভাবে সেই খবর সংগ্রহ করা হচ্ছে সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আইন, মানবাধিকার ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা—এই তিনটি বিষয় মাথায় রেখে কাজ করলে সাংবাদিকতা আরও শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।

সচেতন মহল বলছে, সাংবাদিকদের উচিত নিজেদের ভূমিকা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখা—তারা সমাজের দর্পণ, আইন প্রয়োগকারী নন। সত্য তুলে ধরা তাদের দায়িত্ব, কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও আইনগত সীমারেখা ও নৈতিকতা মেনে চলাই হবে পেশার প্রতি প্রকৃত সম্মান।

একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক সমাজে সাংবাদিকতা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একে অপরের পরিপূরক। তাই দায়িত্বের ভারসাম্য বজায় রেখে নিজ নিজ জায়গা থেকে কাজ করাই হবে সবার জন্য মঙ্গলজনক।

লেখক:সভাপতি,কসবা উপজেলা প্রেসক্লাব,সম্পাদক অপরাধ পত্র পত্রিকা ও কসবা টিভি,মোহনা টেলিভিশন ও দৈনিক ভোরের কাগজ,দি নিউ এজ কসবা প্রতিনিধি।