ছবি-সংগৃহীত
আকলিমা রশীদ ঢালী:
প্রিয় পাঠক,
লালমাইয়ের ট্র্যাজেডি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মাদক শুধু একজন মানুষ নয়, ধ্বংস করে পুরো পরিবার।
আমি নিজেও একজন অতি সাধারণ মানুষ, একজন পরিবারের সদস্য। পত্রিকার পাতায় এমন একটি সংবাদ দেখে আজ আর চুপ থাকতে পারলাম না। ভেবেছিলাম হয়তো আর দশটা ঘটনার মতো এটিও পড়ে ভুলে যাবো, কিন্তু এই খবরটি হৃদয়ে এমনভাবে নাড়া দিয়েছে যে, কলম ধরতেই হলো। কারণ এটি শুধু একটি হত্যার খবর নয়—এটি একটি পরিবারের দীর্ঘদিনের কান্না, এক পিতার অসহায়ত্ব এবং এক সন্তানের ধীরে ধীরে অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়ার গল্প।

কুমিল্লার লালমাইয়ে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক ঘটনাটি আমাদের সমাজের এক নির্মম বাস্তবতা তুলে ধরেছে। ৭০ বছর বয়সী বাবা হিরণ মিয়া, যিনি হয়তো একসময় ছেলেকে বুকে আগলে রেখে বড় করেছেন, শেষ পর্যন্ত সেই সন্তানের জীবন নিজ হাতেই কেড়ে নিতে বাধ্য হলেন। ঘটনাটি ঘটে ভুলইন দক্ষিণ ইউনিয়নের একটি বাড়িতে—যেখানে প্রতিদিনের অশান্তি একদিন রক্তাক্ত পরিণতিতে গিয়ে থামে।
নিহত মোহাম্মদ উল্লা, বয়স ৪০। পরিবার বলছে, দীর্ঘদিন ধরে তিনি মাদকাসক্ত ছিলেন। মাদকের জন্য অর্থের চাপ, নিয়মিত পারিবারিক সহিংসতা, এমনকি পরিবারের নারী সদস্যদের প্রতিও অনৈতিক আচরণ—সব মিলিয়ে একটি পরিবার প্রতিদিন ভেঙে পড়ছিল। তারা প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছিল, শাস্তিও হয়েছিল, কিন্তু মাদকের ভয়াল থাবা থেকে তাকে ফেরানো যায়নি।

ঘটনার দিনও ছিল তেমনই এক উত্তপ্ত মুহূর্ত। তর্ক-বিতর্ক, উত্তেজনা—এক পর্যায়ে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। আর সেই মুহূর্তের ক্রোধ, হতাশা ও অসহায়ত্ব মিলে এক ভয়াবহ সিদ্ধান্তে পৌঁছে দেয় একজন বাবাকে।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয় হলো—ঘটনার পর সেই বাবা নিজেই পুলিশকে ফোন করেন। যেন তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, যা ঘটে গেছে তা আর কোনোভাবেই ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।
প্রিয় পাঠক, এই ঘটনাটি আমাদের সামনে কয়েকটি কঠিন প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়—আমরা কি আমাদের পরিবারগুলোকে যথেষ্ট নিরাপত্তা দিতে পারছি?মাদকাসক্তদের জন্য কার্যকর পুনর্বাসন কি সত্যিই আছে?
আর একজন বাবা কতটা অসহায় হলে এমন চরম সিদ্ধান্ত নিতে পারেন?আইনের বিচারে এটি একটি গুরুতর অপরাধ—এবং এর বিচার হওয়া অবশ্যই জরুরি। কিন্তু মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি এক গভীর ট্র্যাজেডি, যেখানে অপরাধী ও ভুক্তভোগী—দুজনই একই পরিবারের, একই যন্ত্রণার অংশ।

এই ঘটনা আমাদের শিখিয়ে দেয়—মাদক শুধু একজন ব্যক্তিকে নয়, পুরো একটি পরিবারকে ধ্বংস করে দেয়। তাই প্রয়োজন কেবল আইন প্রয়োগ নয়, বরং সচেতনতা, পারিবারিক সহায়তা এবং কার্যকর পুনর্বাসন ব্যবস্থার বিস্তার।
প্রিয় পাঠক—একটি পরিবার হারানোর এই বেদনা যেন আর কোনো ঘরে না পৌঁছায়। আমরা যদি এখনই সচেতন না হই, তাহলে এমন ট্র্যাজেডি বারবার আমাদের সমাজকে নাড়া দেবে।

লেখক:ডিগ্রী অধ্যায়নরত শিক্ষার্থী,বিশেষ প্রতিবেদক অপরাধ পত্র,চ্যানেল ২৬ প্রতিনিধি,নিউজ প্রেজেন্টার কসবা টিভি।