ছবি-ফাইল
সরেজমিন থেকে ফিরে স্টাফ রিপোর্টার:
সীমান্তঘেঁষা জনপদ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা ও আখাউড়ায় মাদক পাচার রোধে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তব চিত্রে এখনো দৃশ্যমান পরিবর্তন আসেনি। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিনিয়ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে মাদক উদ্ধার ও পাচারকারী আটক হলেও অদৃশ্য শক্তির কারণে থামছে না এই অবৈধ বাণিজ্য।
“উদ্ধার হচ্ছে মাদক, ধরা পড়ছে বাহক—অধরাই রয়ে যাচ্ছে গডফাদাররা”
এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, কসবা-আখাউড়া সীমান্ত দীর্ঘদিন ধরেই মাদক পাচারের একটি ঝুঁকিপূর্ণ রুট হিসেবে পরিচিত। বিভিন্ন সময়ে সীমান্তপথ ব্যবহার করে ইয়াবা, গাঁজা, ভারতীয় মদসহ নানা ধরনের মাদক দেশে প্রবেশ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও পুলিশ ও বিজিবি নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে মাদক জব্দ ও সন্দেহভাজনদের আটক করছে, তারপরও পাচার চক্রের মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কসবা-আখাউড়ার জননেতা ও সংসদ সদস্য মুশফিকুর রহমান মাদক নিয়ন্ত্রণে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার দেওয়ার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। সীমান্ত এলাকায় মাদক প্রতিরোধে কঠোর নজরদারি ও প্রশাসনিক তৎপরতা বাড়ানোর আহ্বানও জানানো হয়। কিন্তু বাস্তবে মাদক কারবার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসায় জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সচেতন নাগরিকদের প্রশ্ন—যদি প্রতিনিয়ত মাদক উদ্ধার হয়, তাহলে এই পাচার চক্রের মূল শক্তি কোথায়? কারা এই অবৈধ ব্যবসার পেছনে থেকে নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে? সীমান্তের কোন কোন দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে তারা বারবার সক্রিয় হয়ে উঠছে? এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে চায় সাধারণ মানুষ।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই মাদক নির্মূল সম্ভব নয়; প্রয়োজন সমন্বিত সামাজিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা। তারা বলছেন, সংসদ সদস্য মুশফিকুর রহমানের ডিও লেটারের আলোকে প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডভিত্তিক মাদক প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা জরুরি। এসব কমিটিতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ইমাম, যুবসমাজ ও সচেতন নাগরিকদের সম্পৃক্ত করে পুলিশ ও বিজিবির সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করলে ইতিবাচক ফল আসতে পারে।
তবে সচেতন মহলের একাংশের দাবি, দলীয় নেতাদের সরাসরি সম্পৃক্ত করা হলে কমিটির নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। কারণ অতীতে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে কিছু মাদক কারবারি প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পেয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাই মাদক প্রতিরোধ কমিটিকে দলীয় প্রভাবমুক্ত ও স্বচ্ছ রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
এছাড়া প্রতিটি এলাকায় মাদকবিরোধী কার্যক্রম, সন্দেহজনক চলাচল, মাদকের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িতদের হালনাগাদ তালিকা এবং প্রতিরোধমূলক উদ্যোগের নিয়মিত প্রতিবেদন স্থানীয় এমপি, জেলা প্রশাসক, জেলা পুলিশ সুপার এবং স্থানীয় সাংবাদিক সংগঠনগুলোর কাছে উপস্থাপনের দাবি উঠেছে। পাশাপাশি কমিটির কার্যক্রম ও সফলতার অগ্রগতি নিয়মিত মূল্যায়নের কথাও বলছেন সচেতন নাগরিকরা। তাদের মতে, জবাবদিহিতা ও সমন্বিত নজরদারি নিশ্চিত করা গেলে মাদক প্রতিরোধ কার্যক্রমে সফলতার আলোর মুখ দেখা সম্ভব হতে পারে।
স্থানীয় বিশ্লেষকদের মতে, শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান নয়, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সামাজিক সচেতনতা এবং জনগণের অংশগ্রহণ একসঙ্গে কাজ করলেই সীমান্ত এলাকায় মাদকের ভয়াবহ বিস্তার রোধ করা সম্ভব হবে। সবচেয়ে বড় কথা, কোনো মাদক ব্যবসায়ী বা সেবনকারী যেন দলীয় পরিচয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় না পায়, সেদিকে কঠোরভাবে নজর রাখতে হবে। নির্বাচনে কাজ করেছে কিংবা পরিচিত ব্যক্তি—এমন অজুহাতে কোনো অপরাধীকে প্রশ্রয় দেওয়া হলে মাদকবিরোধী সব উদ্যোগ ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
সচেতন মহলের ভাষ্য, “কোনো মাদক ব্যবসায়ী ও অপরাধীর দলীয় পরিচয় থাকতে পারে না।” কারণ মাদক শুধু একজন ব্যক্তিকে নয়, ধ্বংস করে একটি পরিবার, একটি সমাজ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে।
“ইউনিয়ন/ওয়ার্ড মাদক প্রতিরোধ ও সামাজিক সচেতনতা কমিটি”
১। স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রতিনিধি
২। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক/সরকারি কর্মকর্তা
৩। সম্মানিত আলেম/ইমাম/ধর্মীয় নেতা
৪। নারী সমাজ প্রতিনিধি
৫। স্থানীয় সাংবাদিক প্রতিনিধি
প্রতি মাসে কার্যক্রমের প্রতিবেদন পাঠাতে হবে—
“মাদক কোনো দলের নয়, এটি সমাজ ধ্বংসের হাতিয়ার। তাই মাদক প্রতিরোধে সবাইকে দল-মত নির্বিশেষে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।”