প্রিয় পাঠক,
সহকর্মী ছোট হোক কিংবা বড়—প্রত্যেকেই সম্মান ও মর্যাদার দাবিদার। কেউ স্নেহের পাত্র, আবার কেউ শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত। কর্মক্ষেত্রে পারস্পরিক সম্মান, সৌহার্দ্য ও মানবিক আচরণই একটি সুন্দর পরিবেশ গড়ে তোলে। তাই কাউকে ছোট করে দেখা, খাটো করা কিংবা অবমূল্যায়ন করা কখনোই সমীচীন নয়। কারণ সম্মান দিলে সম্মান ফিরে আসে, আর পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধই সহকর্মীদের মাঝে বিশ্বাস ও ঐক্যের বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে।
সহযোদ্ধাদের বিভিন্ন লেখা, অভিজ্ঞতা আর সমাজের চলমান বাস্তবতার দৃশ্যপট সামনে রেখেই আজ দুই কলম লিখতে বসলাম। দীর্ঘ পেশাগত জীবনে প্রায় ৪৫ বছর পথচলায় আমরা দেখেছি—সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের চিন্তা বদলেছে, বদলেছে সমাজের রূপও। কিন্তু কিছু সত্য কখনও পুরোনো হয় না। সমাজের বিভক্তি, স্বার্থের দ্বন্দ্ব আর নীরব কষ্টের ভেতর দাঁড়িয়ে আজও ঐক্যের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়। সেই অনুভূতি থেকেই এই লেখার অবতারণা।

একসময় গ্রামের প্রবীণদের মুখে একটি কথা প্রায়ই শোনা যেত—“যে যত কবরে চালাকি, পরে বুঝবে তার জ্বালাকি।”আজ সমাজের নানা সংকট, বিভক্তি আর পারস্পরিক অবিশ্বাসের বাস্তবতায় সেই কথাগুলো যেন নতুন করে অর্থ খুঁজে পাচ্ছে।
একসময় প্রবীণ ও সচেতন মানুষরা সমাজকে ঐক্যবদ্ধ রাখার চেষ্টা করতেন। মতভেদ থাকলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা, দায়বদ্ধতা ও মানবিক সম্পর্ক ছিল দৃশ্যমান। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে ব্যক্তি স্বার্থ, দলীয় বিভাজন এবং প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা সমাজের ভেতরে নতুন এক দূরত্ব তৈরি করেছে।

স্থানীয়দের মতে, আজ মানুষে মানুষে বিভক্তির সুযোগ নিচ্ছে বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহল। কোথাও প্রশাসনিক প্রভাব, কোথাও রাজনৈতিক হিসাব—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের ঐক্য দুর্বল হয়ে পড়ছে। ফলে প্রবীণ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা অনেক ক্ষেত্রেই নীরব দর্শকের ভূমিকায় থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। কারণ তারা দেখছেন, সত্য কথা বললেও তা অনেক সময় গ্রহণ করার মানসিকতা কমে যাচ্ছে।
আজ এই পরিস্থিতির জন্য কারা দায়ী—সমাজের সচেতন মানুষ এখন তা ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করেছেন। বাস্তবতা হচ্ছে, অতিরিক্ত চালাকি কিংবা স্বার্থের রাজনীতি করে কেউ দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না। সময়ই একদিন সব হিসাব সামনে এনে দেয়।

অভিজ্ঞ মহলের মতে, যারা অতীত থেকে শিক্ষা নিতে চান না, তারা বারবার একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করেন। আর সেই ভুল সিদ্ধান্ত, বিভ্রান্তিকর আচরণ ও ব্যক্তি স্বার্থের দ্বন্দ্ব একসময় সমাজের মূল্যবোধের পাশাপাশি নিজ নিজ পেশার মর্যাদাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে আস্থার জায়গাগুলো ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে।
আজ চারপাশের নানা ঘটনা, আচরণ ও বাস্তবতার ভেতর দিয়ে অনেকেই সেই আলামতের নমুনা স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছেন। তাই এখনও সময় আছে আত্মসমালোচনা করার, ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার এবং ব্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সমাজ ও পেশার মর্যাদা রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হওয়ার।

সচেতন মহল বলছে, একটি সমাজ তখনই দুর্বল হয়ে পড়ে, যখন সেখানে পারস্পরিক আস্থা কমে যায়। মানুষ যখন দল, গোষ্ঠী বা ব্যক্তিস্বার্থে বিভক্ত হয়, তখন সামগ্রিক উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হয়। আর সেই সুযোগে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি ও প্রভাবশালী গোষ্ঠী নিজেদের সুবিধা আদায় করে নেয়।
প্রবীণদের ভাষ্য, এখনও সময় আছে নিজেদের ভুল বোঝাবুঝি দূর করে ঐক্যের পথে ফেরার। কারণ সমাজ টিকে থাকে পারস্পরিক সহযোগিতা, সহনশীলতা ও মানবিক সম্পর্কের ওপর। দলাদলি কখনও স্থায়ী সমাধান এনে দেয় না; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংকট আরও গভীর করে।

গ্রামীণ জীবনের সহজ উদাহরণ টেনে অনেকেই বলেন, পানিতে মাছসহ নানা প্রাণী বসবাস করলেও মানুষ সেই পানি ব্যবহার করে জীবনের প্রয়োজনে। অর্থাৎ প্রকৃতি ও সমাজ—দুটিই সহাবস্থানের শিক্ষা দেয়। কিন্তু মানুষ যদি মানুষকে অস্বীকার করে, বিভাজনের দেয়াল তোলে, তাহলে সেই সমাজে শান্তি ও উন্নয়নের আলো পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে।

শেষবারের মতো প্রবীণদের আহ্বান—“আর নয় দলাদলি, এখন প্রয়োজন ঐক্য ও সচেতনতা।”কারণ সমাজকে যদি সাময়িক স্বার্থের “টিস্যু পেপার” হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতের সুন্দর আলো আর উদ্ভাসিত হবে না। ঐক্য, সততা ও পারস্পরিক সম্মানই পারে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ, সুন্দর ও দায়িত্বশীল সমাজ গড়ে তুলতে।
লেখক: সভাপতি,কসবা উপজেলা প্রেসক্লাব,সম্পাদক প্রকাশক-অপরাধপত্র,কসবা টিভি,মোহনা টেলিভিশন ও দৈনিক ভোরের কাগজ কসবা প্রতিনিধি।