ছবি-সংগৃহীত
খ.ম.হারুনুর রশীদ ঢালী:
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কেটে গেছে ৫৩ বছর। সময়ের পরিক্রমায় বদলেছে রাষ্ট্রনীতি, বদলেছে সরকার, বদলেছে জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনিক কাঠামো। কিন্তু একটি প্রশ্ন আজও জনমনে ঘুরপাক খায়—“এত অভিযান, এত বক্তব্য, এত প্রতিশ্রুতির পরও মাদক কেন বন্ধ হচ্ছে না?”
সীমান্তঘেঁষা জনপদ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা-আখাউড়া অঞ্চলে এই প্রশ্ন এখন আরও তীব্র। কারণ প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও মাদক উদ্ধার, আটক কিংবা চোরাচালানের খবর সামনে আসছে। অথচ রাজনৈতিক নেতা, প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি—সকলেই প্রকাশ্যে মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কথা বলেন।

সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ (কসবা-আখাউড়া) আসনের সংসদ সদস্য মুশফিকুর রহমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও বার্তা দিয়ে মাদক প্রতিরোধে প্রশাসনসহ সাধারণ মানুষের সহযোগিতা কামনা করেছেন। তিনি যুবসমাজকে রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। তার এই উদ্যোগ সাধারণ মানুষের মাঝে ইতিবাচক আলোচনার জন্ম দিলেও বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে—“শুধু আহ্বানেই কি মাদক বন্ধ হবে?”
সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত পেরিয়ে দেশে প্রবেশকালে পুলিশের গোপন সংবাদের ভিত্তিতে একাধিক মাদক জব্দ ও আসামি আটকের ঘটনা সামনে এসেছে। এসব ঘটনায় স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, সীমান্ত এলাকায় মাদক প্রতিরোধে পুলিশের দৃশ্যমান তৎপরতা অনেক ক্ষেত্রেই প্রশংসনীয় হয়ে উঠেছে।

বিশেষ করে নাজনীন সুলতানা কসবা থানায় অফিসার ইনচার্জ হিসেবে যোগদানের পর সহযোগী কর্মকর্তাদের নিয়ে ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করে মাদক ও পাচারকারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন বলে এলাকাবাসীর মধ্যে আলোচনা রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বিভিন্ন অভিযানে মাদক উদ্ধার ও গ্রেপ্তারের ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে গোয়েন্দা তথ্য ও মাঠপর্যায়ের নজরদারি জোরদার হলে চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। তবে একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও। যদিও সরাসরি কোনো বাহিনীকে দোষারোপ করা হচ্ছে না, তবুও সীমান্ত দিয়ে ধারাবাহিকভাবে মাদক প্রবেশের ঘটনায় দায়িত্ব ও নজরদারি নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সচেতন মহলের মতে, সীমান্ত রক্ষার দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর আরও সমন্বিত ও কঠোর ভূমিকা প্রয়োজন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মাদক শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি এখন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাবের জটিল এক চক্রে পরিণত হয়েছে। সীমান্ত এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা কিছু অসাধু সিন্ডিকেট স্থানীয় দালাল, বহিরাগত চক্র এবং প্রভাবশালী ছত্রছায়াকে ব্যবহার করে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে মাঝে মধ্যে অভিযান হলেও “মূল হোতারা” অধিকাংশ সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। ফলে ছোটখাটো বাহক বা খুচরা বিক্রেতা আটক হলেও পুরো নেটওয়ার্ক অক্ষত থেকে যায়। আর এই কারণেই বারবার অভিযান পরিচালনার পরও মাদক নির্মূলের দৃশ্যমান ফল মিলছে না।
সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, সীমান্ত এলাকায় বেকারত্ব, দ্রুত অর্থ উপার্জনের লোভ, সামাজিক অবক্ষয় এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়া—এই চারটি কারণ মাদক বিস্তারের অন্যতম ভিত্তি। তরুণদের একটি অংশ সহজ আয়ের আশায় এই অন্ধকার পথে জড়িয়ে পড়ছে। অন্যদিকে অনেক পরিবার ভয় কিংবা সামাজিক চাপে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পায় না।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, শুধু বক্তৃতা, মানববন্ধন কিংবা ভিডিও বার্তায় মাদক নির্মূল সম্ভব নয়। প্রয়োজন গোড়ায় হাত দেওয়া। সীমান্ত নজরদারি জোরদার, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, সামাজিক আন্দোলন এবং যুবকদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ কঠিন।
জনমনে তাই একটাই প্রত্যাশা—মাদকের বিরুদ্ধে ঘোষণার চেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ বেশি প্রয়োজন। অভিযান যেন হয় নিরপেক্ষ, তদন্ত যেন পৌঁছে যায় মূল পরিকল্পনাকারীদের পর্যন্ত, আর রাষ্ট্র যেন সত্যিকার অর্থে “মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স” বাস্তবায়ন করতে পারে।বি:দ্র: প্রথম যে ছবিটি প্রথম ক্যাপশনে দিয়েছিলাম তা এডিট করার সময় সমস্যা হয়েছিল তার জন্য আন্তরিক ভাবে দু:খিত। সাথে সাথে আমরা ঐ ছবিটি বদল করে এখন সঠিক ক্যাপশন করে দিয়েছি।
লেখক: সভাপতি,কসবা উপজেলা প্রেসক্লাব,সম্পাদক প্রকাশক ,অপরাধ পত্র, মোহনা টেলিভিশন ও দৈনিক ভোরের কাগজ কসবা প্রতিনিধি।