ছবি-সংগৃহীত
আকলিমা রশীদ ঢালী,কসবা টিভি ডেস্ক:
মানুষের মৃত্যু একসময় ছিল শোক, নীরবতা আর সহমর্মিতার বিষয়। কারো মৃত্যুর সংবাদ শুনলে প্রতিবেশী ছুটে যেত, আত্মীয়-স্বজন পাশে দাঁড়াত, পরিচিতরা দোয়া করত। কিন্তু সময় বদলেছে। প্রযুক্তির এই যুগে শোকের প্রকাশও এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের রিঅ্যাকশনে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। আর সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—কারো মৃত্যুর সংবাদেও এখন অনেকে “হা হা” রিঅ্যাক্ট দিতে দ্বিধা করেন না।

ফেসবুক কিংবা অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে প্রায়ই দেখা যায়, কোনো দুর্ঘটনা, অসুস্থতা বা মৃত্যুর সংবাদ প্রকাশের পর সেখানে সহানুভূতির পরিবর্তে “হা হা” রিঅ্যাক্ট ভেসে ওঠে। কখনো ভুলবশত, আবার অনেক সময় ইচ্ছাকৃতভাবেও এমনটি করা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—একজন মানুষের মৃত্যুর খবরেও হাসির প্রতিক্রিয়া দেওয়ার মতো মানসিকতা কীভাবে তৈরি হচ্ছে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষকে ধীরে ধীরে আবেগহীন করে তুলছে। ভার্চুয়াল জগতে দীর্ঘ সময় কাটাতে কাটাতে বাস্তব জীবনের অনুভূতি ও মানবিক মূল্যবোধ অনেকের মধ্যেই কমে যাচ্ছে। ফলে অন্যের কষ্ট, শোক কিংবা মৃত্যু অনেকের কাছে আর হৃদয় ছুঁয়ে যায় না।

আবার একশ্রেণির মানুষ সামাজিক ও রাজনৈতিক বিদ্বেষ থেকেও মৃত্যুর সংবাদে বিদ্রূপাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখান। মতের অমিল থাকতেই পারে, ব্যক্তি নিয়ে সমালোচনাও থাকতে পারে; কিন্তু মৃত্যু তো শেষ সত্য। সেখানে বিদ্বেষ নয়, মানবিকতাই হওয়া উচিত সবচেয়ে বড় পরিচয়।
সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, এটি শুধু ব্যক্তিগত আচরণের সমস্যা নয়; বরং সমাজের সামগ্রিক নৈতিক অবক্ষয়েরও প্রতিচ্ছবি। যখন মানুষ অন্যের মৃত্যুতে কষ্ট অনুভব করতে ভুলে যায়, তখন সমাজে সহমর্মিতা, শ্রদ্ধাবোধ ও পারস্পরিক মূল্যবোধও ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যেতে থাকে।

অনেকেই যুক্তি দেন, ভুল করে “হা হা” রিঅ্যাক্ট পড়ে যায়। সেটি ঘটতেই পারে। তবে সচেতনতার অভাবও এখানে বড় কারণ। কোনো সংবেদনশীল সংবাদে প্রতিক্রিয়া জানানোর আগে অন্তত একবার ভাবা উচিত—এই পোস্টের ওপাশে একজন শোকাহত পরিবার আছে, আছে স্বজন হারানোর বেদনা।

একটি সভ্য সমাজ কেবল উন্নত প্রযুক্তিতে গড়ে ওঠে না; গড়ে ওঠে মানবিকতা, সহানুভূতি ও পারস্পরিক সম্মানবোধের ওপর। তাই মৃত্যুর সংবাদে বিদ্রূপ নয়, প্রয়োজন নীরবতা, সম্মান ও সহমর্মিতা। কারণ আজ যার মৃত্যুতে আমরা হাসছি, কাল হয়তো শোকের সেই ছায়া আমাদের ঘরেও নেমে আসতে পারে।