ছবি-সংগৃহীত
আকলিমা রশীদ ঢালী:
প্রিয় পাঠক,
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের মতামত, বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণ আমাদের সামনে আসে। এর মধ্যে কিছু লেখা কেবল আলোচনার খোরাক জোগায়, আবার কিছু লেখা আমাদের চিন্তা করতে শেখায়, আত্মসমালোচনার সুযোগ করে দেয় এবং সমাজ-বাস্তবতা সম্পর্কে নতুনভাবে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে। আমার বাবার সাথে তার একটা সুসম্পর্ক রয়েছেন। শুধু বাবার সাথে নয় সকলের সাথেই সুসম্পর্ক আছেন।
কসবা থানার এস আই ফারুক হোসাইন (আংক্কেল) এমন একজন লেখক, ফেইসবুকে যিনি প্রায়শই সমাজ, নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ ও ব্যক্তিগত আচরণ নিয়ে গঠনমূলক মতামত প্রকাশ করে থাকেন। তাঁর লেখাগুলোতে অহংকার, বিনয়, আত্মসমালোচনা, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানুষের চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে গভীর পর্যবেক্ষণ ফুটে ওঠে।
সম্প্রতি তাঁর একটি লেখায় মানুষের অহংকার, আত্মগর্ব এবং তার পরিণতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ভাবনা উঠে এসেছে। সেই লেখার আলোকে আজকের ফিচার— "অহংকার নয়, বিনয়ই মানুষের প্রকৃত পরিচয়"।
মানুষের জীবনে সাফল্য, ক্ষমতা, অর্থ, খ্যাতি কিংবা সামাজিক মর্যাদা আসতেই পারে। এগুলো অর্জন করা যেমন কঠিন, তেমনি অর্জনের পর নিজেকে সংযত রাখা আরও কঠিন। ইতিহাস ও সমাজের দিকে তাকালে দেখা যায়, অনেক মানুষ সাময়িক সাফল্যের মোহে নিজেকে অন্যদের চেয়ে বড় মনে করতে শুরু করে। ধীরে ধীরে তার মধ্যে জন্ম নেয় অহংকার, আত্মপ্রশংসা এবং অন্যকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার প্রবণতা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অহংকার মানুষের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাগুলোর একটি, যা একসময় তাকে পতনের দিকে ঠেলে দেয়।
প্রকৃতপক্ষে মানুষের মর্যাদা তার পদ-পদবি, সম্পদ কিংবা ক্ষমতায় নয়; বরং তার চরিত্র, ব্যবহার, মানবিকতা ও বিনয়ের মধ্যে নিহিত। একজন মানুষ যত বড়ই হোক না কেন, যদি সে অন্যকে সম্মান দিতে না জানে, তবে তার অর্জনের মূল্য অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়। অন্যদিকে একজন সাধারণ মানুষও তার সুন্দর আচরণ ও বিনয়ের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী স্থান করে নিতে পারেন।
একটি প্রাচীন প্রবাদ আছে— "ফলবান গাছ সবসময় নত থাকে।" প্রকৃত জ্ঞানী ও যোগ্য মানুষ কখনো নিজের যোগ্যতা নিয়ে অহংকার করেন না। তারা জানেন, জীবনে শেখার কোনো শেষ নেই। তাই তারা নিজের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করেন এবং অন্যের মতামতকে গুরুত্ব দেন। বিপরীতে যারা সামান্য অর্জনেই নিজেকে অপরাজেয় মনে করেন, তারা প্রায়ই বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।
সমাজে আমরা প্রায়ই দেখি, কিছু মানুষ ক্ষমতা বা প্রভাবের কারণে নিজেদেরকে অন্যদের ঊর্ধ্বে মনে করতে শুরু করেন। তারা ভাবেন, তাদের অবস্থান চিরস্থায়ী। কিন্তু ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, কোনো ক্ষমতা, কোনো পদ কিংবা কোনো প্রভাবই স্থায়ী নয়। সময়ের চাকা ঘুরে যায়, পরিস্থিতি বদলে যায়, আর তখন মানুষের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায়। যারা মানুষের পাশে থেকেছেন, মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন, তারাই মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা অর্জন করেন। আর যারা অহংকারে অন্ধ হয়ে মানুষকে অবহেলা করেছেন, তাদের স্মরণ করা হয় নেতিবাচক উদাহরণ হিসেবে।
অহংকারের আরেকটি বড় ক্ষতি হলো, এটি মানুষকে আত্মসমালোচনা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। একজন অহংকারী ব্যক্তি নিজের ভুল স্বীকার করতে চান না। তিনি মনে করেন, তার সব সিদ্ধান্তই সঠিক। ফলে তিনি নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ হারিয়ে ফেলেন। অন্যদিকে বিনয়ী মানুষ নিজের ভুলকে স্বীকার করেন, সংশোধনের চেষ্টা করেন এবং প্রতিনিয়ত নিজেকে উন্নত করার পথ খুঁজে নেন।
আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে অনেকেই নিজেদের সাফল্য প্রদর্শনের প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত। কিন্তু প্রকৃত সাফল্য কখনো প্রচারের মাধ্যমে নয়, কর্মের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়। মানুষের মুখে মুখে যে সম্মান ছড়িয়ে পড়ে, সেটিই সবচেয়ে বড় অর্জন। নিজের গুণের প্রচার নিজে না করে এমন কাজ করা উচিত, যাতে মানুষ নিজ থেকেই তার প্রশংসা করে।
তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত অন্যকে ছোট না করে নিজের উন্নতির দিকে মনোযোগ দেওয়া। অন্যের ব্যর্থতা দেখে আনন্দিত না হয়ে নিজের সীমাবদ্ধতা দূর করার চেষ্টা করা। কারণ জীবনের শেষ হিসাব মানুষ তার কথার জন্য নয়, কাজের জন্যই দেয়। পদ-পদবি, ক্ষমতা ও সম্পদ একদিন হারিয়ে যেতে পারে, কিন্তু সুন্দর চরিত্র, বিনয় ও মানবিকতা মানুষের হৃদয়ে চিরস্থায়ী হয়ে থাকে।
সবশেষে বলা যায়, অহংকার মানুষকে সাময়িকভাবে উঁচুতে তুলতে পারে, কিন্তু বিনয়ই তাকে স্থায়ী সম্মান এনে দেয়। তাই বড় হওয়ার চেয়ে ভালো মানুষ হওয়ার চেষ্টা করাই জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য।
লেখক: ডিগ্রী---শিক্ষার্থী ও চ্যানেল ২৬ কসবা প্রতিনিধি,বিশেষ প্রতিবেদক অপরাধ পত্র ও কসবা টিভি।