সাংবাদিকতা: শৈল্পিক স্বতা, সহনশীলতা ও সহশীলতার ত্রিমাত্রিক সহাবস্থান

সত্যবাক:
প্রিয় পাঠক
শিল্পীর গানের কলি দিয়ে শুরু করতে চাই “তুই কেন কাদা দিলি সাদা কাপড়ে “।আমি মনে করি সাংবাদিকতার তিনটি ফ্রেমে এক বিনাসূতার মালায় বাধায় তাই একজন পেশাধার সাংবাদিকতায় দায়িত্বশীল বলে নিজেকে মেনে নিতে হচ্ছে ,দু:খ কষ্ট,অপমান,অপ সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদদের ৫২/৫৩ এর খেলার সকল যাতনা।এই মহত পেশাতে অপ রাজনীতি, অনিয়ম,অপরাধের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেই টিকে থাকতে হয়। এই যুদ্ধটি জনম জনম ধরে করতে হচ্ছে।কালো বিড়ালদের খেলা রাতের অন্ধকারে নয় আলোতেই খেলা করে অন্য কেউ এই খেলায় অংশ গ্রহণ করেন না ।তবে এক মাত্র পেশাদার সাংবাদিকরাই যুদ্ধ ঘোষণা করে লেখনির মাধ্যমে।

সাংবাদিকতা—একটি দায়িত্বশীল পেশা, যেখানে সত্য ও নৈতিকতার পাশাপাশি প্রয়োজন শৈল্পিক উপস্থাপন। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে—আমরা কি সেই মানদণ্ড ধরে রাখতে পারছি? আজকের প্রতিবেদনে থাকছে সাংবাদিকতার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ—শৈল্পিক স্বতা, সহনশীলতা ও সহশীলতা নিয়ে আজকের বিশেষ প্রতিবেদন।

সাংবাদিকতা কেবল তথ্য পরিবেশনের একটি মাধ্যম নয়; এটি একটি দায়িত্বশীল, সৃজনশীল এবং নৈতিক চর্চার নাম। একজন প্রকৃত সাংবাদিকের কাজের ভেতরে থাকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ—শৈল্পিক স্বতা, সহনশীলতা এবং সহশীলতা। এই তিনটি “স” একত্রে মিলে গড়ে তোলে একটি সুস্থ, মানবিক ও বিশ্বাসযোগ্য সাংবাদিকতা।

প্রথমত, শৈল্পিক স্বতা সাংবাদিকতার প্রাণ। একটি সংবাদ কেবল তথ্যের সমষ্টি নয়, বরং তা উপস্থাপনের ভঙ্গি, ভাষার সৌন্দর্য এবং বিশ্লেষণের গভীরতার মধ্য দিয়ে পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়। একজন দক্ষ সাংবাদিক তার লেখায় এমনভাবে বাস্তবতা তুলে ধরেন, যাতে তা যেমন সত্যনিষ্ঠ হয়, তেমনি পাঠকের মনেও দাগ কাটে। এই শৈল্পিকতা সংবাদকে প্রাণবন্ত করে তোলে, তবে তা কখনোই সত্য বিকৃতির হাতিয়ার হতে পারে না।

দ্বিতীয়ত, সহনশীলতা একজন সাংবাদিকের অন্যতম প্রধান গুণ। সংবাদ প্রকাশের পর সমালোচনা, ভিন্নমত কিংবা চাপ—এসবের মুখোমুখি হওয়া একজন মিডিয়াকর্মীর নিত্যদিনের বাস্তবতা। কিন্তু একজন পেশাদার সাংবাদিক সব সময় ধৈর্য ধরে, যুক্তির মাধ্যমে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন। কারণ তিনি জানেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেমন তার অধিকার, তেমনি অন্যের মতামত প্রকাশের অধিকারও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

তৃতীয়ত, সহশীলতা বা পারস্পরিক সহাবস্থান সাংবাদিকতার নৈতিক ভিত্তিকে শক্তিশালী করে। একটি সুস্থ গণমাধ্যম পরিবেশে ভিন্ন মত, ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি এবং ভিন্ন চিন্তাকে সম্মান জানানো জরুরি। সহশীলতার অভাবই অনেক সময় বিভাজন, অপপ্রচার এবং ব্যক্তিগত আক্রমণের জন্ম দেয়। কিন্তু একজন সচেতন সাংবাদিক সবসময় পেশাগত শালীনতা বজায় রেখে অন্যের অবস্থানকে সম্মান করতে শেখেন।

বর্তমান সময়ে যখন তথ্যের চেয়ে মতামত বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে, তখন এই তিনটি গুণের গুরুত্ব আরও বেড়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহজলভ্যতার কারণে অনেকেই যাচাই-বাছাই ছাড়াই তথ্য প্রচার করছেন, যা সাংবাদিকতার মূল নীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এই পরিস্থিতিতে শৈল্পিক স্বতা, সহনশীলতা ও সহশীলতার সমন্বয়ই হতে পারে একটি দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পথনির্দেশ।

একটি উন্নত, সংবেদনশীল ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিসীম। আর সেই গণমাধ্যমকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে হলে সাংবাদিকদের এই তিনটি গুণকে আত্মস্থ করতে হবে। কারণ সাংবাদিকতা কোনো প্রতিযোগিতা নয়—এটি একটি সামাজিক দায়বদ্ধতা, যেখানে সত্য, নৈতিকতা এবং মানবিকতাই সর্বোচ্চ মূল্যবোধ।

সাংবাদিকতার মূল শক্তি তার বিশ্বাসযোগ্যতা। আর এই বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জিত হয় তখনই, যখন একজন সাংবাদিক তার কাজের মধ্যে শৈল্পিকতা, সহনশীলতা ও সহশীলতার সুষম প্রয়োগ ঘটাতে পারেন। তাই বলা যায়—এই তিনটি “স” কেবল গুণ নয়, বরং একটি সুস্থ সাংবাদিকতার ভিত্তি।

লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক পাক্ষিক অপরাধ পত্র,সভাপতি,কসবা উপজেলা প্রেসক্লাব ও দৈনিক ভোরের কাগজ প্রতিনিধি।
নিজস্ব প্রতিবেদক

