পাগলামির মধ্যেই জন্ম নেয় সম্ভাবনা—কসবার সাংবাদিকতা জাগরণের গল্প

ফারজানা রশীদ ঢালী:
প্রিয় পাঠক, আমরা কারো পক্ষে বা বিপক্ষে নই। পেশাগত দায়বদ্ধতা থেকে নিরপেক্ষভাবে সবার কাজ তুলে ধরার চেষ্টা করি। আপনার ভিন্ন মত থাকতেই পারে—আমরা সেটিকে সম্মান করি। সংবাদকর্মী হিসেবে আমরা তথ্য উপস্থাপন করি, আর পাঠক হিসেবে আপনাদের মতপ্রকাশের পূর্ণ অধিকার রয়েছে।

আমার বাবা—তিনি ছিলেন “একজন বড় পাগল”। অন্তত সমাজের চোখে তাই-ই মনে হতো। কিন্তু সেই পাগলামিই আজ কসবার সাংবাদিকতা জাগরণের ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার সাহসী উদ্যোগে কসবায় সর্বপ্রথম প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয়। আর সেই একটি সিদ্ধান্তই তৈরি করেছে অসংখ্য গুণী সাংবাদিকের পথচলা।

ইতিহাস বড়ই নির্মম—যারা ইতিহাস সৃষ্টি করে, অনেক সময় তারাই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত হয়। ব্যক্তিস্বার্থের কাছে অনেকেই ভুলে যায় সেই পথপ্রদর্শকদের অবদান। অথচ ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, যারা অবদানকে অস্বীকার করে, তারা একসময় নিজের অজান্তেই হারিয়ে যায় সময়ের স্রোতে।

আমাদের মাঝে সঠিক সংবাদ পরিবেশনের প্রতিযোগিতা থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রতিহিংসা, মিথ্যা তথ্য কিংবা অপপ্রচারের প্রতিযোগিতা কখনোই সমাজের মঙ্গল বয়ে আনতে পারে না। বরং এটি ধ্বংস করে বিশ্বাস, নষ্ট করে সাংবাদিকতার মূল আদর্শ।

আমার বাবা সংসারলোভী মানুষ ছিলেন, কিন্তু প্রচলিত অর্থে সংসারী নন। সহযোদ্ধার মিথ্যা মামলা,অপ প্রচার আর শত অপমান, দুঃখ-কষ্ট আর প্রতিকূলতার মাঝেও তিনি সত্য সংবাদ প্রকাশে ছিলেন অবিচল। প্রতিটি মানুষের পক্ষে বিপক্ষে মন্তব্য থাকবেই,আর প্রতিটি সংবাদের পক্ষে বিপক্ষে মন্তব্য থাকা স্বাভাবিক হতেই পারে কিন্ত সংবাদের তথ্যগত দিক সঠিক কি না সেইটাই মূল কথা। একটি সংবাদ আপনার তথ্যগত কারণে পক্ষে গেলে ধন্যবাদ আর তথ্যগত কারণে বিপক্ষে গেলে গালমন্দ অপ প্রচার করা হচ্ছে জেনেও সঠিক সংবাদ প্রকাশ করতে হবে।

কে পক্ষে আর কে বিপক্ষে তা নিয়ে ভাবনা না রেখে তার চিন্তা-চেতনা ছিল স্পষ্ট—সত্যের পথে থাকতে হবে, যাই আসুক সামনে। আমার দেখা কোনো রাজনৈতিক দল সংবাদ প্রচারে সুবিধা নিচ্ছেন কিন্ত বেলা শেষে ছুড়ে ফেলে দিচ্ছেন আবার বি পক্ষ রাজনৈতিক দল সামান্য সুবিধা পেয়েও অপ প্রচার করছেন । এইটা জেনেও দীর্ঘ ৪৫ বছর তিনি তার কাজ মনের মাদলি দিয়ে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করে নিয়ে পেশাগত কাজ করে যাচ্ছেন। আমি ভেবেছি আমার বাবার পিছনে আলোচনা ও সমালোচনা না থাকলে বাবা আসলে মূল্যহীন হয়ে পড়তেন। আর মানুষ নিয়ে এত মূল্যায়ন করতে পারতাম বা বুঝতাম না। তবে প্রকৃতি কাউকে ছাড় দেয় না।

আমরা অনেক সময় না বুঝে, না ভেবে— সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত একটি ছবি বা ভিডিও দেখেই হঠাৎ করে মন্তব্য করে বসি। অথচ একটু সময় নিয়ে গভীরে গিয়ে ভাবলে, বিশ্লেষণ করলে—মানুষ বিভ্রান্ত হয় না, অযথা কেউ সমালোচিতও হয় না। আবেগ আমাদের মানবিক গুণ, কিন্তু অতিরিক্ত আবেগ কখনোই ভালো ফল বয়ে আনে না। আবেগ থাকা ভালো, তবে তা নিয়ন্ত্রিত হওয়াই শ্রেয়।

বাবা প্রায়ই বলতেন, “পাগল ছাড়া দুনিয়া চলে না।” আজ বুঝতে পারি, তিনি ভুল বলেননি। আমার দেখা, তিনি ছিলেন একজন সত্যিকারের “মিডিয়া পাগল” বাবা—এই পেশার প্রতি তার ভালোবাসা, দায়বদ্ধতা আর সংগ্রাম ছিল অনন্য। তিনি লড়েছেন, এখনও লড়ছেন। আর সময়ের শেষে তার সেই লড়াইয়ের জয় আমি নিজ চোখে দেখেছি।

মানুষ সাধারণত “পাগল” শব্দটিকে নেতিবাচক অর্থে দেখে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ইতিহাস বলে—যাদের একসময় পাগল বলা হয়েছিল, তারাই পরবর্তীতে সমাজ পরিবর্তনের পথ দেখিয়েছে। কসবার প্রেক্ষাপটেও সেই বাস্তবতা স্পষ্ট—একজন মানুষের “পাগলামি” আজ বহু মানুষের সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করেছে।

“আমি বড় পাগল না হলে কসবায় প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠিত হতো না”—এই কথার মধ্যে লুকিয়ে আছে আত্মত্যাগ, দূরদৃষ্টি এবং অদম্য সাহস। কারণ কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্ম সহজ নয়। বিশেষ করে মফস্বলে সাংবাদিকতার মতো একটি পেশাকে সংগঠিত করা মানে প্রতিকূলতা, বিরোধিতা এবং অবজ্ঞার মুখোমুখি হওয়া। যারা এসব উপেক্ষা করে সামনে এগিয়ে যায়, তাদের অনেকেই শুরুতে “পাগল” হিসেবেই পরিচিত হয়।

কসবার প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠা শুধু একটি সংগঠন গড়া নয়—এটি ছিল একটি চিন্তার বিপ্লব। এটি তরুণদের শিখিয়েছে স্বপ্ন দেখতে, দিয়েছে নিজস্ব কণ্ঠ প্রকাশের একটি প্ল্যাটফর্ম। একসময় যেখানে সংবাদকর্মী হওয়া ছিল বিরল, আজ সেখানে অসংখ্য সাংবাদিক সমাজের নানা অসংগতি তুলে ধরছে, মানুষের কথা বলছে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছে।

এই “পাগলামি” আসলে ছিল এক ইতিবাচক শক্তি—যেখানে ব্যর্থতার ভয় নেই, আছে শুধু কিছু করার তাগিদ। যারা ভিন্নভাবে চিন্তা করে, নতুন কিছু শুরু করে—তাদের পথ কখনোই সহজ হয় না। কিন্তু তাদের সেই অদম্য প্রচেষ্টা একসময় সমাজের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়ায়।

পাগলামি মানেই উন্মাদনা নয়; এটি হতে পারে সৃজনশীলতা, সাহস এবং দৃঢ়তার অন্য নাম। পৃথিবীর বড় বড় পরিবর্তন এসেছে এমন মানুষদের হাত ধরেই, যারা প্রচলিত সীমার বাইরে গিয়ে ভাবতে পেরেছে।

শেষ পর্যন্ত বলা যায়, দুনিয়া শুধু নিয়ম মেনে চলে না—চলে কিছু মানুষের ব্যতিক্রমী চিন্তা, সাহসী উদ্যোগ এবং সেই তথাকথিত “পাগলামি”র ওপর ভর করেই। কারণ এই পাগলরাই সমাজকে নতুন পথে এগিয়ে নিয়ে যায়।
লেখক: দি মনিং গ্লোরি (দৈনিক ইংরেজি পত্রিকা),কসবা উপজেলা প্রতিনিধি ও নিউজ প্রেজেন্টার কসবা টিভি।
নিজস্ব প্রতিবেদক

