“সমাজের দর্পণ সাংবাদিকতা, আইন প্রয়োগ নয়”

খ.ম.হারুনুর রশীদ ঢালী:
তথ্য প্রকাশের অধিকার আছে, কিন্তু প্রয়োগের ক্ষমতা রাষ্ট্রের—আইন মেনেই পেশার মর্যাদা রক্ষা জরুরি।গণমাধ্যমকে বলা হয় সমাজের দর্পণ। সত্য তুলে ধরা, অন্যায় উদঘাটন এবং জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশ—এসবই সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি। তবে আইনগত দৃষ্টিতে সাংবাদিকরা কখনোই আইন প্রয়োগকারী নন; এই দায়িত্ব একান্তই রাষ্ট্রের নির্ধারিত সংস্থাগুলোর। সাম্প্রতিক নানা ঘটনায় এই সীমারেখা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাংবাদিকদের কাজ হলো তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশ করা—কিন্তু কাউকে আটকানো, জিজ্ঞাসাবাদ করা, পরিচয় উন্মোচনে বাধ্য করা কিংবা শারীরিক হস্তক্ষেপ করা আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। এসব কাজ করলে তা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

সংবিধান ও আইনের দৃষ্টিতে সীমারেখা-বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে একই সঙ্গে বলা হয়েছে, এই স্বাধীনতা “যৌক্তিক বিধিনিষেধ” সাপেক্ষে প্রয়োগ করতে হবে—যেখানে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, শালীনতা, মানহানি বা আদালত অবমাননার বিষয়গুলো বিবেচ্য।

অন্যদিকে, Code of Criminal Procedure, 1898-এর ৫৪ ধারা অনুযায়ী গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। একইভাবে, Penal Code, 1860-এর ৩৫১ ও ৩৫২ ধারায় অননুমোদিত শারীরিক স্পর্শ বা আক্রমণকে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।এছাড়া, Digital Security Act, 2018-এর বিভিন্ন ধারায় ব্যক্তির সম্মতি ছাড়া তার তথ্য, ছবি বা ভিডিও অপব্যবহারের বিষয়েও শাস্তির বিধান রয়েছে। ফলে কোনো ব্যক্তির মুখ জোরপূর্বক উন্মোচন বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন আইনগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

পেশাগত নৈতিকতা ও বাস্তবতা-গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞদের মতে, সাংবাদিকতার নীতি হচ্ছে—“তথ্য তুলে ধরা, কিন্তু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ নয়।” কোনো ঘটনার ভিডিও ধারণ করা বা তথ্য সংগ্রহ করা বৈধ হলেও, আইন প্রয়োগের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া পেশাগত সীমা অতিক্রমের শামিল।একজন সিনিয়র সাংবাদিক বলেন, “আমরা সত্য তুলে ধরব, কিন্তু বিচার করব না—এই জায়গাটা স্পষ্ট থাকতে হবে।” কারণ বিচার ও আইন প্রয়োগের দায়িত্ব আদালত ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর।

সচেতন মহল মনে করছে, সাংবাদিকতা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা—দুই পক্ষই সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একদিকে গণমাধ্যম অন্যায় তুলে ধরে জনমত তৈরি করে, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়। তাই পারস্পরিক সম্মান ও দায়িত্ববোধ বজায় রাখা জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাংবাদিকরা যদি নিজেদের পেশাগত সীমা মেনে চলেন এবং আইনগত কাঠামোর মধ্যে থেকে কাজ করেন, তাহলে গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা আরও দৃঢ় হবে।সবশেষে বলা যায়, সাংবাদিকরা সমাজের দর্পণ—তারা সত্য দেখান, কিন্তু আইন প্রয়োগ করেন না। এই মৌলিক নীতিই পেশাটিকে সুশৃঙ্খল, গ্রহণযোগ্য ও শক্তিশালী করে তোলে।

লেখক:সভাপতি,কসবা উপজেলা প্রেসক্লাব, সম্পাদক-প্রকাশক অপরাধ পত্র পত্রিকা ও কসবা টিভি,মোহনা টেলিভিশন ও দৈনিক ভোরের কাগজ,দি নিউ এজ কসবা প্রতিনিধি।
নিজস্ব প্রতিবেদক

