ইউএনও পাম্পে শৃঙ্খলা ফেরাতে লাঠি হাতে : দায়িত্ব, সীমা ও নাগরিক প্রত্যাশা

ছবি-সংগৃহীত
আকলিমা রশীদ রশীদ ঢালী:
প্রিয় পাঠক,
আমিও একজন নারী। ভেবেছিলাম—এই বিষয়টি নিয়ে আজ আর লিখব না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিবেকের তাড়নায় কলম ধরতেই হলো।
আমাদের সবারই মতপ্রকাশের অধিকার আছে—এটি গণতান্ত্রিক সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তবে সেই মতপ্রকাশ যেন দায়িত্বশীল, সংযত এবং গঠনমূলক হয়—এই প্রত্যাশা রাখি। সমালোচনা অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু তা যেন ব্যক্তি আক্রমণ বা আবেগপ্রসূত প্রতিক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবতা ও যুক্তির ওপর দাঁড়ায়।

আসুন, আমরা এমন একটি পরিবেশ তৈরি করি, যেখানে ভিন্নমত থাকবে—কিন্তু থাকবে পারস্পরিক সম্মান, সচেতনতা এবং ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি।এখন মূল লেখায় আসি।
সমাজে শৃঙ্খলা বজায় রাখা শুধু প্রশাসনের একক দায়িত্ব নয়; এটি নাগরিক সচেতনতা, পারস্পরিক সম্মান ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধার সমন্বয়ে গড়ে ওঠে। আমরা অনেক সময় বিশৃঙ্খলার শিকার হলে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করি, আবার কঠোরতা দেখলেই প্রশ্ন তুলি। এই দ্বৈত মনোভাব আমাদের ভাবতে বাধ্য করে—শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় আসলে আমাদের প্রত্যাশা কী? একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে আমাদের কি শুধু সমালোচক হয়ে থাকা উচিত, নাকি বাস্তবতাও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি?
রংপুরের কালীগঞ্জে একটি জ্বালানি তেল পাম্পকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক ঘটনাটি সেই প্রশ্নগুলো নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামীমা আক্তার জাহান পাম্প এলাকায় দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে সরাসরি মাঠে নেমে কাজ করছেন—যা সাধারণত কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে।

তেল নিতে আসা মোটরসাইকেলচালকদের দীর্ঘ লাইন, হুড়োহুড়ি ও নিয়ম ভঙ্গের প্রবণতা থেকে প্রায়ই দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছিল। এমন পরিস্থিতিতে একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে তিনি শুধু নির্দেশনা দিয়ে থেমে থাকেননি; বরং লাঠি হাতে উপস্থিত থেকে শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা করেছেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি শুরু থেকেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় ছিলেন এবং জনসাধারণকে নিয়ম মানতে বারবার সতর্ক করেছেন।
তবে ঘটনাটি নতুন মোড় নেয়, যখন এক মোটরসাইকেলচালককে চড় মারার অভিযোগ সামনে আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবিতে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। কেউ বলছেন—শৃঙ্খলা ফেরাতে কঠোর পদক্ষেপ সময়ের দাবি ছিল, আবার অন্যরা প্রশ্ন তুলছেন—একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তার এমন আচরণ কতটা গ্রহণযোগ্য?

এখানেই মূল বিতর্কটি স্পষ্ট হয়: আইন প্রয়োগ বনাম মানবিক আচরণ। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোরতা প্রয়োজন, কিন্তু সেই কঠোরতারও একটি সীমা ও পদ্ধতি রয়েছে। একজন সরকারি কর্মকর্তার প্রতিটি পদক্ষেপই আইনগত ও নৈতিক মানদণ্ডের মধ্যে থাকা প্রত্যাশিত।
অন্যদিকে, বাস্তবতাও অস্বীকার করা যায় না। পাম্প এলাকায় দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খলা, নিয়ম অমান্য এবং জনভোগান্তি—এসব পরিস্থিতি প্রশাসনকে প্রায়ই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। অনেক সময় বারবার সতর্ক করার পরও যখন নিয়ম মানা হয় না, তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।

ঘটনাটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—একজন নারী কর্মকর্তা হিসেবে মাঠ পর্যায়ে তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি। আমাদের সমাজে এখনও অনেক ক্ষেত্রে নারী নেতৃত্বকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখা হয়। অথচ এখানে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন দৃঢ়ভাবে, যা প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু সেই প্রশংসা যেন অন্ধ সমর্থনে রূপ না নেয়, আবার সমালোচনাও যেন বাস্তবতা বিবর্জিত না হয়—এই ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি।
আমার ভাবনা-এই ঘটনা আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রেখে যায়—শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা শুধু প্রশাসনের দায়িত্ব নয়, নাগরিকেরও দায়িত্ব। নিয়ম না মানার প্রবণতা যদি আমরা নিজেদের মধ্যে দূর করতে পারি, তাহলে এমন কঠোর পরিস্থিতির প্রয়োজনই পড়ে না।

প্রশাসনের উচিত আইনানুগ ও সংযত আচরণের মাধ্যমে শৃঙ্খলা বজায় রাখা, আর নাগরিকের উচিত সেই শৃঙ্খলাকে সম্মান করা। কারণ শেষ পর্যন্ত, একটি সুশৃঙ্খল সমাজ গড়ে ওঠে পারস্পরিক দায়িত্ববোধ ও সচেতনতার উপরই।
লেখক: ডিগ্রী অধ্যায়ন শিক্ষার্থী,বিশেষ প্রতিবেদক অপরাধপত্র, নিউজ প্রেজেন্টার কসবা টিভি ও চ্যানেল ২৬ প্রতিনিধি।
নিজস্ব প্রতিবেদক

