কসবা সীমান্তে মোবাইল সংকেতে সীমান্ত কাঁপায় চোরাকারবারি সিন্ডিকেট

স্টাফ রিপোর্টার ,কসবা টিভি ডেস্ক:
ভারতের ত্রিপুরা সীমান্তঘেঁষা কসবা উপজেলার সদর, গোপীনাথপুর, কায়েকপুর ও বায়েক ইউনিয়ন দীর্ঘদিন ধরেই মাদক ও চোরাচালানের অন্যতম ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট ব্যবহার করে প্রতিনিয়ত মাদকসহ নানা নিষিদ্ধ পণ্য দেশে প্রবেশ করছে।
স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, সন্ধ্যা নামলেই সক্রিয় হয়ে ওঠে সীমান্তভিত্তিক চোরাকারবারি চক্র। মোবাইল ফোনে গোপন সংকেত ও “লাইন ক্লিয়ার” বার্তা আদান-প্রদানের মাধ্যমে শুরু হয় অবৈধ সীমান্ত পারাপার। কাঁটাতারের বেড়া, ধানের জমির আইল, খাল ও সরু চিপা রাস্তা ব্যবহার করে চোরাকারবারিরা ভারতে প্রবেশ করে বিভিন্ন পণ্য সংগ্রহ করে আবার দেশে ফিরে আসে।
এভাবে গাঁজা, মদ, ফেনসিডিল, ইয়াবা, স্কফ সিরাপ, শাড়ি, থ্রি-পিস ছাড়াও কাপড়, কসমেটিকস, মোবাইল ফোন, মাছের পোনা ও বিভিন্ন পণ্য অবৈধভাবে পাচার হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সম্প্রতি কসবা সীমান্ত এলাকায় বিএসএফের গুলিতে দুই বাংলাদেশি নিহত এবং অন্তত কয়েকজন আহত হওয়ার ঘটনায় সীমান্তঘেঁষা গ্রামগুলোতে শোক ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। নিহত কলেজছাত্র মোরসালিন ও নবীর হোসেনের কবর জিয়ারত করতে গিয়ে নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী সীমান্ত হত্যা বন্ধে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করেন। একই সঙ্গে তিনি সীমান্ত হত্যা বন্ধ না হলে লংমার্চ কর্মসূচির হুঁশিয়ারিও দেন।একই সাথে গত শুক্রবার গণঅধিকার পরিষদ সীমান্ত হত্যা বন্ধ না হলে কসবা আখাউড়ায় লংমার্চ কর্মসূচির হুঁশিয়ারিও দেন ।
স্থানীয়দের দাবি, গত দুই বছরে কসবা সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে কয়েকজন নিহত এবং প্রায় ২০ জন আহত হয়েছেন। অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রায় ১৯ কিলোমিটার সীমান্তজুড়ে এসব অবৈধ কার্যক্রম বিস্তৃত। সীমান্তের কিছু এলাকায় কাঁটাতারের ঘাটতি, খাল ও নদীপথ থাকায় চোরাচালান আরও সহজ হয়ে উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী সিন্ডিকেট ও তাদের নিয়ন্ত্রিত “লেবার” বাহিনীর সহযোগিতায় শতাধিক সীমান্ত পয়েন্ট ব্যবহার করে অবৈধ পণ্য আনা-নেওয়া করা হচ্ছে। রাতের “সবুজ সংকেত” পেলেই পুরো নেটওয়ার্ক সক্রিয় হয়ে ওঠে।
সূত্র জানায়, প্রতিটি বহনকারী বা “লেবার” কাজের বিনিময়ে ৫০০ টাকা থেকে কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করে। টাকার লোভ দেখিয়ে তরুণসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষকে এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়িয়ে ফেলছে চোরাচালানি গডফাদাররা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশ সুপার শাহ মো. আব্দুর রউফ জানান, সীমান্ত এলাকায় মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে। কসবার তিনটি ইউনিয়নে অর্ধশতাধিক মাদক স্পট চিহ্নিত হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। অন্যদিকে কসবা থানা পুলিশ বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালিয়ে মাদক ও অবৈধ মালামালসহ একাধিক চোরাকারবারিকে গ্রেফতার করেছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, কসবা সদরের খারপাড়া, তারাপুর ও আকাবপুর,হাকরসহ কয়েকটি সীমান্তগ্রামে প্রভাবশালী কিছু মাদক পাচারকারী দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হলে সীমান্তের মাদক ও চোরাচালান অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে মনে করছেন তারা। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করেও অনেকে এই অবৈধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। ধজনগর,লক্ষীপুর,খিরনাল,কুইয়াপানিয়া,বায়েক কোল্লাপাথর,পুটিয়া,শ্যামপুর,কাশিরামপুর,গেীরাঙ্গলা,কায়েমপুর চকবস্তা,গংগানগর,চাটুয়াখলা বিভিন্ন স্থান দিয়ে অবাধে মাদকসহ বিভিন্ন কিছু পাচার হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান যথেষ্ট নয়। সীমান্ত এলাকায় বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং যুবসমাজকে অপরাধ থেকে দূরে রাখতে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ জরুরি।
এদিকে স্থানীয় সংসদ সদস্য মুশফিকুর রহমান কসবা-আখাউড়াকে মাদকমুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছেন। সচেতন মহলের মতে, রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে মাদক ব্যবসায়ীদের কোনো ধরনের সহযোগিতা বন্ধ করা গেলে “মাদকমুক্ত কসবা-আখাউড়া” গড়া সম্ভব।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সীমান্তজুড়ে সক্রিয় শক্তিশালী সিন্ডিকেট ভেঙে না দিলে মাদক ও চোরাচালান পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
নিজস্ব প্রতিবেদক

