গণমাধ্যমে আত্মসমালোচনা জরুরি, অহংকার নয় প্রয়োজন দায়বদ্ধতা

খ.ম.হারুনুর রশীদ ঢালী:
প্রিয় পাঠক,“আর নয় দলাদলি,সময় এখন ঐক্যের”ষিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর আমাদের সহকর্মী মোহাম্মদ মোস্তফা সুন্দর গঠনমূলক মতামত দিয়েছেন।
সমাজের দর্পণ হিসেবে গণমাধ্যমের ভূমিকা সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ। একটি সত্য সংবাদ যেমন মানুষের চোখ খুলে দেয়, তেমনি দায়িত্বহীন আচরণ পুরো পেশাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। বর্তমানে স্থানীয় গণমাধ্যম অঙ্গনে পেশাদারিত্ব, নৈতিকতা ও আত্মসমালোচনার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে সাংবাদিকদের পারস্পরিক সম্পর্ক, প্রশাসনের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় সখ্যতা, ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তার এবং অহংকারের সংস্কৃতি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। এসব বাস্তবতা নিয়েই আজকের এই গঠনমূলক ফিচার।
বর্তমান সময়ে গণমাধ্যম সমাজের দর্পণ হিসেবে কাজ করার কথা। সত্য তুলে ধরা, মানুষের কথা বলা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াই একজন সংবাদকর্মীর প্রধান দায়িত্ব। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সাংবাদিকতার অঙ্গনেও নানা ধরনের সংকট ও বিভাজন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ে এখন পেশাদারিত্বের চেয়ে ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তার, আত্মপ্রচার এবং ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার প্রতিযোগিতা অনেক ক্ষেত্রেই বেশি চোখে পড়ছে।
সম্প্রতি মোস্তফা সাহেবের একটি আত্মসমালোচনামূলক বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, গণমাধ্যমে দালালি, অহংকার কিংবা প্রভাব খাটানোর কোনো স্থান নেই। একজন সাংবাদিকের আসল পরিচয় তার দায়িত্ববোধ, সততা ও পেশাদারিত্বে। কে বড় সাংবাদিক, কে বড় নিউজ করেছে কিংবা কে কতটা পরিচিত—এসব বিষয় দিয়ে কখনো প্রকৃত মূল্যায়ন হয় না। মানুষের কাছে সম্মান আসে কাজ ও আচরণের মাধ্যমে।
তার বক্তব্যের পর বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি হয়েছে। কারণ বাস্তবতা হলো, এখনো দেখা যাচ্ছে কিছু ব্যক্তি সরকারি কর্মকর্তা, সরকারি অফিস, উপজেলা প্রশাসন, থানা কিংবা রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় ওঠাবসা করে নিজেদের প্রভাবশালী হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছেন। কোথাও কোথাও সত্য-মিথ্যা তথ্য বলেও নিজেদের অবস্থান শক্ত করার প্রবণতা দেখা যায়। অথচ প্রকৃত পেশাদার মিডিয়াকর্মীরা পেশাগত প্রয়োজন ছাড়া দিন-রাত এসব জায়গায় অবাধে ঘোরাফেরা করেন না।

গতকাল ১৫মে ২০২৬ইং প্রকাশিত ফিচারের শিরোনাম।
এটাই আজ গণমাধ্যমের জন্য বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাধারণ মানুষ এখন অনেক সচেতন। তারা বুঝতে পারে কে দায়িত্ব নিয়ে কাজ করছে আর কে ব্যক্তিস্বার্থে পেশাকে ব্যবহার করছে। ফলে কিছু মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে পুরো গণমাধ্যম অঙ্গনই প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। মিডিয়াকর্মীদের মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতা কমে যাওয়ার পেছনে বাইরের আক্রমণের চেয়ে নিজেদের ভেতরের দুর্বলতাই বেশি দায়ী—এমন কথাও এখন অনেকেই বলছেন।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, কেউ কেউ সত্যকে আড়াল করে “শাক দিয়ে মাছ ঢাকার” চেষ্টায় ব্যস্ত। কিন্তু সত্য কখনো দীর্ঘদিন চাপা থাকে না। সাংবাদিকতার শক্তি সত্য প্রকাশে, সত্য গোপনে নয়। এই পেশা কোনো ব্যক্তিগত আধিপত্য বিস্তারের জায়গা নয়; এটি মানুষের আস্থা ও দায়িত্বের জায়গা।
মোস্তফা সাহেব তার লেখায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সহমত প্রকাশ করে তুলে ধরেছেন—ছোটদের সম্মান দিলে নিজের মর্যাদা কমে না। বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধই একটি সুস্থ গণমাধ্যম পরিবেশ গড়ে তোলে। সিনিয়রদের অভিজ্ঞতা এবং নতুনদের উদ্যম একসঙ্গে মিলেই শক্তিশালী সাংবাদিকতা সম্ভব। সেখানে অহংকার নয়, প্রয়োজন সহযোগিতা ও নৈতিকতা।
আজ সময় এসেছে আত্মসমালোচনা করার। কে কার বিরুদ্ধে, কে কার পক্ষে—এসব সংকীর্ণ চিন্তা থেকে বের হয়ে সাংবাদিকতার মূল আদর্শে ফিরে যেতে হবে। কারণ গণমাধ্যম যদি মানুষের আস্থা হারায়, তাহলে সমাজের সত্য বলার সবচেয়ে শক্তিশালী জায়গাটিই দুর্বল হয়ে পড়বে।
সত্য, সততা ও দায়িত্ববোধই একজন সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় পরিচয়। পদবি, প্রভাব কিংবা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা নয়—মানুষের বিশ্বাস অর্জন করাই হোক গণমাধ্যমকর্মীদের প্রধান লক্ষ্য।
লেখক:সভাপতি,কসবা উপজেলা প্রেসক্লাব,সম্পাদক,প্রকাশক অপরাধ পত্র ও কসবা টিভি, মোহনা টেলিভিশন ও দৈনিক ভোরের কাগজ কসবা প্রতিনিধি।
নিজস্ব প্রতিবেদক

