নৈতিকতার সীমানা কোথায়? কসবায় জোর করে মাস্ক খুলে ভিডিও ধারণকে ঘিরে আইনি ও মানবিক প্রশ্ন ?

আকলিমা রশীদ ঢালী:
প্রিয় পাঠক
এ ধরনের সংবেদনশীল ঘটনায় প্রিয় পাঠকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি দায়িত্বশীল সমাজ গঠনে শুধু সাংবাদিক বা প্রশাসন নয়, সচেতন পাঠকরাও বড় ভূমিকা রাখেন। কোনো ভিডিও, ছবি বা খবর দেখামাত্র তা যাচাই না করে শেয়ার করা থেকে বিরত থাকা জরুরি। বিশেষ করে যেখানে একজন নারীর সম্মান, গোপনীয়তা বা নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত—সেখানে সংযম ও মানবিকতা সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

পাঠকদের উচিত ভুক্তভোগীর প্রতি সহানুভূতিশীল থাকা এবং এমন কনটেন্ট প্রচার না করা, যা তাকে আরও বিব্রত বা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। একই সঙ্গে অনৈতিক আচরণ বা অপসাংবাদিকতার বিরুদ্ধে সামাজিকভাবে প্রতিবাদ গড়ে তোলা দরকার। মূলধারার দায়িত্বশীল সাংবাদিকরাই পারেন এ ধরনের অপপ্রবণতার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলতে—এটাই সময়ের দাবি।

মনে রাখতে হবে, সচেতন পাঠকই পারে সঠিক ও নৈতিক সাংবাদিকতাকে উৎসাহিত করতে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী সামাজিক অবস্থান তৈরি করতে। এই প্রতিবেদনটির উদ্দেশ্য কোনো সাংবাদিক সহকর্মীকে হেয় করা বা ব্যক্তিগতভাবে আঘাত করা নয়; বরং সমাজে দায়িত্বশীল ও নৈতিক সাংবাদিকতার চর্চা নিশ্চিত করা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা।

ঘটনার প্রেক্ষাপট-গত ২০ এপ্রিল ২০২৬ কসবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক নারীকে জোর করে মাস্ক খুলে ভিডিও ধারণের চেষ্টা এবং এ নিয়ে চাপাচাপির অভিযোগে জনমনে তীব্র উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও ঘিরে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিজেকে সাংবাদিক পরিচয়দানকারী একজন ব্যক্তি হাসপাতালের ভেতরে এক নারীর মুখ থেকে মাস্ক খুলে ভিডিও ধারণের চেষ্টা করেন। এতে ওই নারী বিব্রত ও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং উপস্থিত লোকজনের মধ্যেও অসন্তোষ দেখা দেয়।

ভুক্তভোগীর বক্তব্য-উক্ত নারী কসবা হাসপাতালের একজন রোগী ছিলেন বলে তিনি জানান।তিনি একটি ভিডিও বার্তায় জানান, একাধিক ফেসবুক আইডিতে মিথ্যা তথ্য ও অপপ্রচারের কারণে তিনি চরম মানসিক চাপে পড়েছেন। এমনকি এক পর্যায়ে আত্মহত্যার চিন্তাও তার মনে এসেছিল। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এসব ঘটনার কারণে তার পারিবারিক জীবন ভেঙে যেতে পারে। তবে সন্তানদের কথা ভেবে তিনি সেই পথ থেকে ফিরে আসেন। তবে এই সব ফেসবুক আইডিতে মিথ্যা অপ প্রচারকারীদের বিরুদ্ধে দেশের প্রধানমন্ত্রী ও স্থানীয় প্রশাসনের কাছে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান।

জনমত ও প্রশ্ন-স্থানীয় সচেতন মহল এ ঘটনাকে সাংবাদিকতার দায়িত্ব নয়, বরং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মর্যাদার লঙ্ঘন হিসেবে দেখছেন। প্রশ্ন উঠেছে—সংবাদ সংগ্রহের নামে কোনো ব্যক্তির সম্মতি ছাড়া ভিডিও ধারণ কি বৈধ? একজন নারীকে প্রকাশ্যে বিব্রত করা কি পেশাগত নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?

বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে এ ধরনের কর্মকাণ্ড শাস্তিযোগ্য হতে পারে—সংবিধানের ৪৩ অনুচ্ছেদে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ অনুযায়ী অনুমতি ছাড়া ছবি বা ভিডিও ধারণ ও প্রচার অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে নারীর প্রতি অপমানজনক আচরণ দণ্ডনীয়।আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের ঘটনা সাংবাদিকতার প্রতি জনআস্থা কমিয়ে দেয় এবং নারীদের জনপরিসরে অনিরাপদ করে তোলে। তাই—সাংবাদিক পরিচয়ে যেন কেউ ব্যক্তিগত হয়রানি করতে না পারে।গণমাধ্যমকর্মীদের নৈতিকতা মেনে চলা নিশ্চিত করা ভুক্তভোগীর মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষা করা—এসব বিষয়ে জোর দিতে হবে কসবার এই ঘটনা আবারও স্মরণ করিয়ে দেয়—সাংবাদিকতা কোনোভাবেই হেনস্তা বা ব্যক্তিগত আক্রমণের মাধ্যম হতে পারে না। এটি একটি দায়িত্বশীল পেশা, যেখানে মানবিকতা, সংবেদনশীলতা ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাই হওয়া উচিত প্রধান ভিত্তি।

প্রশাসনের দ্রুত তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে সংবেদনশীল স্থানে অননুমোদিত ভিডিও ধারণ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। আরো আসছে বিস্তারিত।(চলমান)

লেখক: ডিগ্রি পর্যায়ের শিক্ষার্থী, নিউজ প্রেজেন্টার কসবা টিভি ও বিশেষ প্রতিনিধি অপরাধ পত্র পত্রিকা।
নিজস্ব প্রতিবেদক

