সালদা-বাখরাবাদ– কসবায় সঞ্চালন লাইন ছিদ্র করে গ্যাস চুরির চেষ্টা, আতঙ্ক

খ.ম.হারুনুর রশীদ ঢালী,কসবা (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি:
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার ভারত সীমান্তবর্তী এলাকায় উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন গ্যাস সঞ্চালন লাইন ছিদ্র করে গ্যাস নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (বিজিসিএল) ওই লাইন মেরামত করেছে।
স্থানীয় সূত্র ও সরেজমিনে জানা গেছে, কসবা উপজেলার বায়েক ইউনিয়নের সাগরতলা ও ধোপাখোলা এলাকায় সালদা গ্যাসক্ষেত্র থেকে বাখরাবাদ গ্যাসক্ষেত্রের দিকে যাওয়া প্রায় ১০ ইঞ্চি ব্যাসের উচ্চচাপের সঞ্চালন লাইনে দুটি ছিদ্র করা হয়। এর একটি দিয়ে সংযোগ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি।
গত মঙ্গলবার রাতে সঞ্চালন লাইনে ছিদ্র করার সময় বিকট শব্দে গ্যাস বের হওয়ার আওয়াজ শোনা যায়। একই সঙ্গে এলাকায় গ্যাসের তীব্র গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। ধোপাখোলা এলাকার এক বাসিন্দা জানান, রাত প্রায় ২টার দিকে বিকট শব্দে তাঁর ঘুম ভেঙে যায়। ওই রাতে বিদ্যুৎও ছিল না। এ ধরনের উচ্চচাপের গ্যাসলাইন থেকে দুর্ঘটনা ঘটলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা ছিল বলে তিনি জানান।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কসবা বায়েক ইউনিয়নের কুল্লাপাথর এলাকায় একটি চুন কারখানায় গ্যাস সরবরাহের জন্য একটি চক্র মেইন সঞ্চালন লাইন থেকে অবৈধভাবে গ্যাস নেওয়ার চেষ্টা করে। কারখানাটির চারপাশে প্রায় ৩০ ফুট উঁচু টিনের বেড়া থাকায় ভেতরের কার্যক্রম বাইরে থেকে সহজে দেখা যেত না বলেও স্থানীয়রা জানান।
বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর বুধবার সকালে স্থানীয় বিএনপির সাবেক সভাপতি নাদিজ্জামান রুমি ভূঁইয়া স্থানীয় সংসদ সদস্য, সালদা গ্যাস ফিল্ডের কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের বিষয়টি অবহিত করেন।
নাদিজ্জামান রুমি ভূঁইয়া অভিযোগ করে বলেন, গ্যাস চুরির ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে এখনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তবে একটি দৈনিক পত্রিকায় তাঁকে নিয়ে তিনজনের নাম উল্লেখ করে যে সংবাদ প্রকাশ হয়েছে, সেটি সঠিক নয় বলে দাবি করেন তিনি। ওই ঘটনার কথা শুনেছেন, তবে কারা এর সঙ্গে জড়িত তা তিনি জানেন না বলেও জানান।
অন্যদিকে, চুন কারখানার জায়গার মালিক মেহেদী হাসান বলেন, গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৮ সালের ৩০ জুলাই পর্যন্ত দুই বছরের জন্য ঢাকার একটি পক্ষের কাছে জায়গাটি ভাড়া দিয়েছেন। এ বিষয়ে তাঁর কাছে স্ট্যাম্পে করা চুক্তিপত্র রয়েছে। গ্যাস চুরির বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না বলে দাবি করেন তিনি। দোকানদার বোরহানের ভাষ্য, ঘটনার আগের দিন কারখানার লোকজন আমার দোকান থেকে প্রায় ১৭ হাজার টাকার চাল, ডাল, তেল ও অন্যান্য মালামাল বাকিতে নিয়ে পালিয়ে চলে যায়।
বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের জিএম (অপারেশন) জাহিদুর রেজা বলেন, ‘‘এটি হাইপ্রেসার লাইন। সালদা ও বাখরাবাদ গ্যাস ফিল্ডের মাঝখানে ১০ ইঞ্চি পাইপলাইনটি প্রায় ৬০০ পিএসআই চাপে পরিচালিত হচ্ছিল। কে বা কারা এখানে দুটি অফটেক বের করে গ্যাস নেওয়ার চেষ্টা করেছে। একটিতে সংযোগ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, অন্যটিতে পারেনি।’’
তিনি জানান, বৃহস্পতিবার মাটি খুঁড়ে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর কোম্পানির ভিজিল্যান্স বিভাগকে জানানো হয়। পরে ড্রোনের মাধ্যমে অনুসন্ধান করে কুল্লাপাথর এলাকায় একটি চুন কারখানার সন্ধান পাওয়া যায়। কারখানাটি নিম্নচাপের আবাসিক লাইন থেকে গ্যাস ব্যবহার করছিল বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়।
জাহিদুর রেজা আরও বলেন, উচ্চচাপের লাইনের গ্যাস বন্ধ রেখে বাপেক্স ও বিজিসিএলের সমন্বয়ে লাইনটি নিরাপদ করা হয়েছে। পরে শনিবার সঞ্চালন লাইনের ছিদ্র মেরামত করা হয়।
সালদা গ্যাস ফিল্ডের ইনচার্জ মো. নুরুজ্জামান ও ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) কামাল হোসেন বলেন, বিষয়টি মূলত বাখরাবাদ গ্যাস ফিল্ডের আওতাধীন। খবর পাওয়ার পর বুধবার বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের জানানো হয়। শনিবার মেরামতকাজে প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
এই দিকে স্থানীয় সংসদ সদস্য মুশফিকুর রহমান এই ঘটনার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে ডিও লেটার প্রদান করেন।
কসবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সামিউল ইসলাম বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘‘বাখরাবাদ ও সালদা গ্যাস ফিল্ডের পক্ষ থেকে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে। তাই আমি তাদের বিস্তারিত লিখিতভাবে জানাতে বলেছি। বিষয়টি জেলা প্রশাসককে অবহিত করা হবে।’’
স্থানীয়রা উচ্চচাপের সঞ্চালন লাইন ছিদ্র করে গ্যাস নেওয়ার চেষ্টার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কারণে বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে গ্যাস সঞ্চালন লাইনের নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানান তারা।
উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালে সালদা গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়। ১৯৯৮ সালের ২৮ মার্চ বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু হয়। বর্তমানে তিনটি কূপ থেকে গড়ে প্রায় সাড়ে ৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক

