কসবায় জাল সনদ তৈরির অভিযোগে অভিযান, দুই কম্পিউটার দোকানকে জরিমানা

ছবি-সংগৃহীত
আকলিমা রশীদ ঢালী:
প্রিয় পাঠক,
মোবাইল কোর্টে তাৎক্ষণিক শাস্তি, জালিয়াতি চক্র দমনে প্রশাসনের কঠোর অবস্থান।
জাল সনদ—শব্দটি শুনতে ছোট মনে হলেও এর প্রভাব বিস্তৃত ও গভীর। একটি ভুয়া কাগজ কখনো একটি চাকরি কেড়ে নিতে পারে, একটি জমির মালিকানা বদলে দিতে পারে, এমনকি নিরপরাধ মানুষকে আইনি জটিলতায় ফেলতে পারে। কসবায় সাম্প্রতিক অভিযান সেই নীরব কিন্তু ভয়ংকর অপরাধচক্রেরই একটি অংশ উন্মোচন করেছে।

অভিযোগ থেকে অভিযানে-ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা পৌর সুপার মার্কেট এলাকায় ২২ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে জাল ওয়ারিশসনদ, চারিত্রিক সনদ ও প্রত্যয়নপত্র তৈরি এবং বিক্রির অভিযোগ ওঠে। অভিযোগটি আমলে নিয়ে প্রশাসন তাৎক্ষণিকভাবে অভিযান পরিচালনা করে।

অভিযানে দুইটি কম্পিউটার প্রতিষ্ঠানে পাওয়া যায় পৌর প্রশাসক ও বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের নাম ব্যবহার করে তৈরি করা স্বাক্ষরিত ও স্বাক্ষরবিহীন ব্ল্যাঙ্ক সনদপত্র। এসব সনদে নাম-ঠিকানা না থাকলেও স্মারক নম্বর ও তারিখ উল্লেখ ছিল—যা পরবর্তীতে যেকোনো ব্যক্তির নামে বসিয়ে জালিয়াতি কাজে ব্যবহার করা সম্ভব।

সংশ্লিষ্টরা জানান, এই ধরনের সনদপত্র সাধারণত জমি সংক্রান্ত বিরোধ, উত্তরাধিকার দাবি, চাকরির আবেদন কিংবা ব্যাংকিং কার্যক্রমে ব্যবহৃত হয়ে থাকে—যা সমাজে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে।ঘটনাস্থলেই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে“ব্রাদার্স কম্পিউটার”-কে ২০ হাজার টাকা,“সাইফুল এন্ড রাকিব কম্পিউটার”-কে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

অভিযানটি পরিচালনা করেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ তানজিল কবির।তিনি বলেন, “জাল সনদ তৈরি ও বিক্রি একটি গুরুতর অপরাধ। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।”

পূর্বসূত্র: আইনশৃঙ্খলা সভায় উত্থাপন-এই ঘটনাটি হঠাৎ করে সামনে আসেনি।গত ৫জুলাইয়ের আগে কসবা উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় বিষয়টি গুরুত্বসহকারে উপস্থাপন করেছিলেন কসবা উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি খ. ম. হারুনুর রশীদ ঢালী। তখন মাসিক সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন আজকের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ ছামিউল ইসলাম।অর্থাৎ, প্রশাসনের কাছে অভিযোগ আগে থেকেই ছিল। কিছুটা বিলম্ব হলেও শেষ পর্যন্ত অভিযানের মাধ্যমে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে—যা স্থানীয়ভাবে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।

বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী জাল সনদ তৈরি ও ব্যবহার সরাসরি ফৌজদারি অপরাধ।বাংলাদেশ দণ্ডবিধি-এর বিভিন্ন ধারায় এ ধরনের অপরাধের জন্য কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।এছাড়া ভ্রাম্যমাণ আদালত আইন ২০০৯ অনুযায়ী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন, যা এই অভিযানে প্রয়োগ করা হয়েছে।বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কেবল জরিমানা নয়—গুরুতর ক্ষেত্রে নিয়মিত মামলা ও বিচারিক প্রক্রিয়ার আওতায় আনা হলে এই অপরাধ আরও কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

সমাজে প্রভাব ও নীরব দুর্নীতির বিস্তার চলছে।জাল সনদের এই বাণিজ্য সমাজে বহুমাত্রিক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে—প্রকৃত অধিকারীরা বঞ্চিত হন।প্রশাসনিক কার্যক্রমে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় আইনের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায়। দুর্নীতির একটি বিকল্প “সহজ পথ” তৈরি হয় সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এটি একটি নীরব অপরাধচক্র—যা দৃশ্যমান না হলেও সমাজের ভিত দুর্বল করে দেয়।

প্রশাসন ও সচেতন সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রয়োজন—নিয়মিত তদারকি ও হঠাৎ অভিযান বৃদ্ধি। সনদ ইস্যু প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজেশন,সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।জাল সনদ ব্যবহার থেকে বিরত থাকা-এ ধরনের প্রস্তাব পেলে প্রশাসনকে অবহিত করা।সচেতনতা বাড়াতে সামাজিকভাবে ভূমিকা রাখা।কসবায় পরিচালিত এই অভিযান একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে—আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে দীর্ঘদিন অপরাধ চালানো সম্ভব নয়। তবে এই একটি অভিযানই শেষ কথা নয়। ধারাবাহিক নজরদারি, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং সামাজিক প্রতিরোধের মাধ্যমেই কেবল জালিয়াতি চক্র নির্মূল করা সম্ভব।
প্রিয় পাঠক,
সততা ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধা—এই দুইয়ের সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে একটি সুস্থ সমাজ। জাল সনদের বিরুদ্ধে আজকের এই অবস্থান সেই পথেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

লেখক:ডিগ্রী অধ্যায়নরত শিক্ষার্থী,বিশেষ প্রতিবেদক অপরাধ পত্র ও নিউজ প্রেজেন্টার কসবা টিভি,চ্যানেল ২৬ প্রতিনিধি।
নিজস্ব প্রতিবেদক

