জব্দ যানবাহনের স্তূপে বাড়ছে ক্ষয়: কসবা থানায় সম্পদ ব্যবস্থাপনায় নতুন ভাবনার সময়

ফারজানা রশীদ ঢালী:
সংরক্ষণ সংকট, দীর্ঘসূত্রতা আর নীতিগত সীমাবদ্ধতায় অচল হচ্ছে কোটি টাকার সম্পদ।
কোনো একসময় সড়কে ছুটে চলা যানবাহনগুলো এখন নিশ্চুপ। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা থানার ভেতর ও আশপাশে চোখে পড়ে এমন অসংখ্য গাড়ি—যেগুলো আর চলাচলের জন্য নয়, বরং সময়ের কাছে হার মানা একেকটি উদাহরণ। খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকা এসব জব্দ যানবাহন যেন রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনার এক অপ্রকাশিত সংকটের প্রতিচ্ছবি।

আইন প্রয়োগের অংশ হিসেবে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে যানবাহন জব্দ করা হয়। উদ্দেশ্য থাকে তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় প্রমাণ সংরক্ষণ। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, দীর্ঘদিন অযত্নে পড়ে থাকার কারণে এসব যানবাহন ধীরে ধীরে তাদের মূল্য হারাচ্ছে। রোদে বিবর্ণ রঙ, বৃষ্টিতে ক্ষয়প্রাপ্ত ধাতু, আর অব্যবহারে নষ্ট হয়ে যাওয়া যন্ত্রাংশ—সব মিলিয়ে অনেক গাড়িই এখন আর পুনরুদ্ধারের উপযোগী নয়।
এ সমস্যা কেবল একটি থানার নয়; এটি একটি কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দেয়। পর্যাপ্ত গ্যারেজ বা সুরক্ষিত সংরক্ষণাগারের অভাব, মামলার দীর্ঘসূত্রতা এবং প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা মিলেই পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। ফলে জব্দ করার উদ্দেশ্য সফল হলেও, সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
স্থানীয়দের দৃষ্টিতে বিষয়টি আরও স্পষ্ট। তাদের মতে, এটি শুধু অবহেলার প্রশ্ন নয়—বরং পরিকল্পনার ঘাটতি। বছরের পর বছর পড়ে থাকা এসব যানবাহন একদিকে যেমন পরিবেশের জন্য বিরূপ প্রভাব ফেলছে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক দিক থেকেও বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হচ্ছে। অনেকেই মনে করেন, সঠিক ব্যবস্থাপনা থাকলে এই সম্পদ থেকে সরকার উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আয় করতে পারত।

কসবা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজনিন সুলতানা
এ বিষয়ে কসবা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজনিন সুলতানা বলেন, জব্দ যানবাহনের বিষয়ে ইতোমধ্যে আদালতে আবেদন করা হয়েছে। মামলা নিষ্পত্তির পর নিলামের অনুমোদন পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরও জানা যায়, আইনি প্রক্রিয়ার কারণে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয় না। আদালতের নির্দেশনা ছাড়া নিলাম বা বিক্রির উদ্যোগ গ্রহণ করা কঠিন। তবুও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিষয়টি নিয়ে উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে এবং আইনি কাঠামোর ভেতরে থেকেই সমাধানের পথ খোঁজা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় সময়োপযোগী সংস্কার প্রয়োজন। যেমন—ডিজিটাল তালিকা প্রণয়ন, নির্দিষ্ট সময় পর পর্যালোচনা, দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া এবং শর্তসাপেক্ষে নিলামের ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। পাশাপাশি প্রতিটি থানায় বা জেলায় আধুনিক সংরক্ষণাগার নির্মাণও হতে পারে একটি কার্যকর সমাধান।
সব মিলিয়ে, কসবা থানার জব্দ যানবাহনের চিত্রটি একটি বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতিফলন—যেখানে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সম্পদ সংরক্ষণেও সমান গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। সময়োপযোগী উদ্যোগ না নিলে এই ক্ষয় থামানো কঠিন, আর তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে রাষ্ট্র ও জনস্বার্থ—দুই-ই।
লেখক: দৈনিক মনিং গ্লোরি কসবা প্রতিনিধি,নিউজ প্রেজেন্টার কসবা টিভি ও বিশেষ বিশেষ প্রতিবেদক অপরাধ পত্র।
নিজস্ব প্রতিবেদক

