সীমান্তের অন্ধকার অর্থনীতি: চোরাচালান ও মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলনের এখনই সময়– মিডিয়া

ছবি-ফাইল ও সংগৃহীত
আকলিমা রশীদ ঢালী:
প্রিয় পাঠক,
সীমান্ত মানেই শুধু কাঁটাতারের বেড়া নয়; সীমান্ত একটি দেশের নিরাপত্তা, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রতিচ্ছবি। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—দেশের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী অঞ্চলের মতো ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা ও আখাউড়াসহ অনেক এলাকায় আজও সক্রিয় রয়েছে চোরাচালান ও মাদক সিন্ডিকেটের ভয়ংকর নেটওয়ার্ক। আর এই অন্ধকার জগতের বলি হচ্ছে সাধারণ দরিদ্র ও নিরীহ মানুষ।
অভাব-অনটন আর দ্রুত অর্থ উপার্জনের প্রলোভন দেখিয়ে সীমান্তের কিছু অসাধু গডফাদার তরুণদের ঠেলে দিচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ পথে। কেউ মাদকের বাহক হচ্ছে, কেউ চোরাচালানের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। আর এর পরিণতি কখনো সীমান্তে মৃত্যু, কখনো কারাগার, আবার কখনো মামলার আসামি হয়ে পুরো পরিবারকে নিঃস্ব করে দেওয়া।
একটি পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি যখন সীমান্তে গুলিতে নিহত হন বা মাদক মামলায় গ্রেপ্তার হন, তখন শুধু একজন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন না—ধ্বংস হয়ে যায় একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ। সন্তানদের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়, বৃদ্ধ বাবা-মা চিকিৎসাহীন হয়ে পড়েন, সমাজে নেমে আসে অপমান ও অনিশ্চয়তা। অথচ যারা এসব অপকর্মের মূল হোতা, সেই গডফাদাররা অনেক সময় থেকেই যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।
সচেতন মানুষের প্রত্যাশা—কেউ যেন গভীর রাতে সীমান্তে গিয়ে চোরাচালানি মালামাল আনতে গিয়ে বিএসএফের গুলিতে লাশ হয়ে পরিবার-পরিজনের কাছে ফিরে না আসে।(যেমন কসবা ধজনগর সীমান্তের ঘটনা) কোনো মায়ের বুক যেন খালি না হয়, কোনো সন্তানের কান্নায় ঘর অন্ধকার না হয়ে যায়। স্বজন হারানোর আহাজারি ও আর্তচিৎকারে আকাশ-বাতাস যেন আর ভারী না হয়—এটাই এখন সীমান্তবাসীর সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা।
সচেতন মহলের দাবি, শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান দিয়ে এ সমস্যা পুরোপুরি নির্মূল সম্ভব নয়। প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ, জনসচেতনতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা। সীমান্ত এলাকায় মাদক ও চোরাচালানবিরোধী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মাদরাসা, সামাজিক সংগঠন, জনপ্রতিনিধি এবং গণমাধ্যমকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
বর্তমান সরকারের আমলে মাদকের বিরুদ্ধে “জিরো টলারেন্স” নীতির কথা বলা হলেও স্থানীয় পর্যায়ে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা। বিশেষ করে সীমান্ত অঞ্চলে কারা এসব সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে, কারা যুবসমাজকে ব্যবহার করছে, কারা রাতের অন্ধকারে কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য চালাচ্ছে—সেগুলো চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি।
কসবা-আখাউড়া নির্বাচনী এলাকার সংসদ সদস্য মুশফিকুর রহমান মাদক বন্ধে ডিও লেটার প্রদান করেছেন—এ জন্য সচেতন মহল তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছে। তবে শুধু প্রশাসনিক নির্দেশ নয়, রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবেও আরও শক্ত অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে প্রকাশ্যে মাদক ও চোরাচালান প্রতিরোধ আন্দোলনের ডাক দিয়ে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিতে হবে। জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক কর্মী, যুবসমাজ ও সচেতন নাগরিকরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করলে অন্তত ৫০ শতাংশ মাদক সেবন ও চোরাচালান কমে আসবে এবং মাদক ও চোরাকারবারি সিন্ডিকেট ভয় পেয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হবে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
একই সঙ্গে সচেতন নাগরিকদের জোর দাবি—মাদক ও চোরাচালান সিন্ডিকেটের প্রকৃত গডফাদার এবং মূল হোতাদের একটি নির্ভুল তালিকা তৈরি করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর গ্রেফতার অভিযান শুরু করতে হবে। তারা যে দলেরই হোক না কেন, কোনো ধরনের আপস বা রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে থেকে আইন প্রয়োগ করতে হবে। স্থানীয়দের বিশ্বাস, প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি আন্তরিক ও আপোষহীন অবস্থান নেয়, তাহলে মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই মাদক ও চোরাচালান অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। কারণ সমস্যা সমাধানের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে অনেকেই দেখছেন সদিচ্ছা ও কার্যকর উদ্যোগের অভাবকে।
অতীতের অনেক সরকার যে সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান করতে পারেনি, বর্তমান সরকারের আমলে কসবা-আখাউড়ার প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও সফল সংসদ সদস্য মুশফিকুর রহমান-এর কাছে সেই প্রত্যাশা নিয়েই বুক বেঁধে আছে সাধারণ মানুষ। জনগণ চায়—মাদক ও চোরাচালান বন্ধ হোক, ড্রেজার দিয়ে ফসলি জমির ক্ষতি বন্ধ হোক,পাহাড় কাটা বন্ধসহ পরিবেশ রক্ষা হোক , রাস্তাঘাটের উন্নয়ন হোক, খাল দখলমুক্ত করা হোক, চাঁদাবাজি ও দখলবাজির অবসান ঘটুক, মিথ্যা মামলা থেকে সাধারণ মানুষ জানমালের নিরাপত্তা পাক। একই সঙ্গে দলীয় নেতাকর্মীদের নিরপেক্ষ আচরণ এবং সর্বত্র আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হোক—এই প্রত্যাশা থেকেই জনগণ ভোট দিয়ে( মুশফিকুর রহমানকে) তাদের জনপ্রতিনিধিকে বিজয়ী করেছে। জীবনের শেষ বয়সে মানুষ একটি সুন্দর, শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ কসবা-আখাউড়া দেখতে চায়, যেখানে সাধারণ মানুষ ভয়-ভীতি ছাড়াই স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকতে পারবে।
সচেতন মহলের আরও প্রত্যাশা—স্থানীয় মিডিয়াকর্মী, প্রেসক্লাব ও সাংবাদিক সংগঠনগুলো যেন দলীয় প্রভাবমুক্ত থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পায়। কারণ একটি শক্তিশালী, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ গণমাধ্যমই পারে সমাজের বাস্তব চিত্র তুলে ধরতে এবং অন্যায়-অনিয়মের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে। তাই বাকস্বাধীনতাকে আরও গতিশীল ও কার্যকর করতে সাংবাদিকদের নিরাপদ ও স্বাধীন পরিবেশ নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, কোনো প্রেসক্লাবের প্রতিনিধিত্ব সেই প্রেসক্লাবের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধিরাই বিধিমোতাবেক করে থাকেন। একাধিক সংগঠন থাকবে তবে প্রতিনিধিত্ব করবেন যার যার সংগঠন প্রতিনিধি। তাই রাজনৈতিক বা ব্যক্তিস্বার্থে কোনো অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়ানো কিংবা দলীয় প্রভাব খাটানোর সংস্কৃতি থেকে নেতাকর্মীদের বিরত থাকতে হবে। ক্ষমতার বাহাদুরী দেখানো নয়, বরং দেশের প্রচলিত আইন মেনে চলার মানসিকতা ও গণতান্ত্রিক চিন্তাচেতনা নিয়েই রাজনীতি করতে হবে। তাহলেই সমাজে শৃঙ্খলা, জবাবদিহিতা ও পারস্পরিক সম্মানবোধ প্রতিষ্ঠা পাবে।
গণমাধ্যম এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, জনসচেতনতামূলক প্রচারণা এবং বাস্তব চিত্র তুলে ধরার মাধ্যমে সমাজকে জাগ্রত করা সম্ভব। একই সঙ্গে প্রশাসনেরও উচিত তথ্যদাতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নিরীহ মানুষ যাতে হয়রানির শিকার না হয়, সেদিকে নজর রাখা।
আজ সময় এসেছে সীমান্ত অঞ্চলের মানুষকে একটি প্রশ্ন করার—আমরা কি অল্প টাকার লোভে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেব, নাকি মাদক ও চোরাচালানমুক্ত একটি নিরাপদ সমাজ গড়ব?
সচেতন মানুষের প্রত্যাশা, সীমান্তে আর কোনো তরুণ লাশ হয়ে ফিরবে না, কোনো পরিবার মিথ্যা প্রলোভনের ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হবে না। তাই এখনই সময়—মাদক ও চোরাচালান গডফাদারদের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার। এ লড়াই শুধু প্রশাসনের নয়, পুরো সমাজের।
লেখক: ডিগ্রী অধ্যায়নরত শিক্ষার্থী,চ্যানেল ২৬ প্রতিনিধি, বিশেষ প্রতিবেদক অপরাধ পত্র ও নিউজ প্রেজেন্টার কসবা টিভি।
নিজস্ব প্রতিবেদক

