তথ্য গোপনের চাদর: উন্নয়ন, জবাবদিহি ও জনআস্থার সংকট

ছবি-সংগৃহীত
খ.ম.হারুনুর রশীদ ঢালী:
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনপ্রতিনিধিরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে রাষ্ট্র ও স্থানীয় প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তাদের সিদ্ধান্ত, পরিকল্পনা ও কার্যক্রম সরাসরি মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু যখন প্রকৃত তথ্য তাদের কাছ থেকে আড়াল করা হয়, কিংবা বিকৃত ও অসম্পূর্ণ তথ্য উপস্থাপন করা হয়, তখন পুরো ব্যবস্থাটিই এক ধরনের অদৃশ্য চাদরে ঢেকে যায়—যেখানে সত্য চাপা পড়ে থাকে, আর ভুল সিদ্ধান্তের বোঝা বহন করে সাধারণ মানুষ।
বর্তমান সময়ে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম কিংবা স্থানীয় প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে তথ্য গোপনের অভিযোগ নতুন নয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা না জানিয়ে জনপ্রতিনিধিদের কাছে এমন একটি চিত্র তুলে ধরা হয়, যা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে তারা যে সিদ্ধান্ত নেন, তা অনেক সময় জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়। এতে একদিকে যেমন উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়, অন্যদিকে জনপ্রতিনিধিদের প্রতি মানুষের আস্থাও কমে যায়।
কখনো কখনো এই সমস্যা আরও জটিল আকার ধারণ করে যখন কিছু ব্যক্তি নিজেদের স্বার্থে মিডিয়ার একজন প্রকৃত পেশাদার সাংবাদিকের বিরুদ্ধে জনপ্রতিনিধিদের কাছে ভুল তথ্য উপস্থাপন করেন। এর ফলে সেই সাংবাদিককে ইচ্ছাকৃতভাবে বিতর্কিত করা হয় এবং তাকে প্রচার কার্যক্রম থেকে বিরত রাখার চেষ্টা অব্যাহত থাকে। এতে শুধু একজন পেশাদার গণমাধ্যমকর্মীর স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হয় না, বরং সঠিক তথ্যের প্রবাহও বাধাগ্রস্ত হয়।
তথ্য গোপনের এই সংস্কৃতির পেছনে নানা কারণ রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত স্বার্থ, দুর্নীতি বা দায় এড়ানোর প্রবণতা থেকে কর্মকর্তারা প্রকৃত তথ্য গোপন করেন। আবার কোথাও কোথাও রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপের কারণে সত্য তুলে ধরার সাহস হারিয়ে ফেলেন সংশ্লিষ্টরা। এর ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া হয়ে ওঠে একপেশে, এবং বাস্তব সমস্যার সমাধান আর সম্ভব হয় না।
এর প্রভাব শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতায় সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি দীর্ঘমেয়াদে সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ভুল তথ্যের ভিত্তিতে গৃহীত সিদ্ধান্তের কারণে প্রকল্প ব্যর্থ হয়, সরকারি অর্থ অপচয় হয় এবং জনগণের ভোগান্তি বাড়ে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধিরা নিজেরাই সমালোচনার মুখে পড়েন, যদিও প্রকৃতপক্ষে তারা সঠিক তথ্য পাননি।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। তথ্যপ্রবাহকে হতে হবে খোলামেলা ও নির্ভুল। মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা সরাসরি জনপ্রতিনিধিদের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। একইসঙ্গে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে তথ্য ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর ও স্বচ্ছ করা যেতে পারে।
এছাড়া নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম এবং সচেতন জনগণের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তথ্য গোপনের যেকোনো প্রচেষ্টা সামনে নিয়ে আসা, প্রশ্ন তোলা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব। জনপ্রতিনিধিদেরও উচিত তথ্য যাচাই-বাছাইয়ে আরও সতর্ক হওয়া এবং একাধিক উৎস থেকে বাস্তবতা জানার চেষ্টা করা।
সর্বোপরি, একটি উন্নত ও কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থার জন্য সত্যের বিকল্প নেই। তথ্য গোপনের চাদর সরিয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির আলোয় পরিচালিত হলে তবেই জনগণের আস্থা ফিরে আসবে এবং টেকসই উন্নয়নের পথ সুগম হবে।
লেখক: সভাপতি,কসবা উপজেলা প্রেসক্লাব,সম্পাদক প্রকাশক,অপরাধ পত্র ,কসবা টিভি,মোহনা টেলিভিশন ও দৈনিক ভোরের কাগজ কসবা প্রতিনিধি।
নিজস্ব প্রতিবেদক

